কাবিলপুর গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের একটি চর। গত ২০ বছরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে জনবসতি। কিন্তু বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে এখনো যুক্ত হতে পারেনি চরটি। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘সোলার ভিলেজ’। প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হচ্ছে সৌর প্যানেল থেকেই।
সরেজমিনে কাবিলপুর চর ঘুরে এবং চরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় এখন মানুষের কষ্ট অনেকটাই কমেছে। আগে কাবিলপুরের বাসিন্দারা রাতে হারিকেন ও কুপি ব্যবহার করতেন। গরমে কষ্ট পেতে হতো। ছেলেমেয়েদের সমস্যা হতো পড়ালেখায়।
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, কাবিলপুর চরের মতো দেশের অন্য চরাঞ্চলেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এ মডেল ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জমির যে অভাব তার অনেকটাই মিটবে চরের জমিতে। কাবিলপুর চরে ‘ফ্রেন্ডশিপ-সামিট সোলার ভিলেজ ৫৭ দশমিক ৬ কিলোওয়াট পিক ক্ষমতার’ একটি সোলার পার্ক তৈরি করা হয়েছে। এতে সারা দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলেও সন্ধ্যা ও রাতে পর্যায়ক্রমে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারছেন চরবাসী। কাবিলপুর চরে বিদ্যুৎ আসায় সেখানকার বাজারও জমে উঠেছে।
চরটির মোল্লাবাজার ও ছাদেখ্যা বাজারের ২০০-এর বেশি পরিবার সৌরবিদ্যুতের সংযোগ পেয়েছে। চরের ২০০ পরিবার ছাড়াও ৩টি স্কুল, ২টি মাদরাসা এবং ২টি বাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
চর কাবিলপুরের বাসিন্দা মো. কাজিমউদ্দিন বলেন, এই বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য মিটার ভাড়া বাবদ তাদের কাছ থেকে ১১১ টাকা নেওয়া হয়। প্রতি ইউনিট ৪ টাকা করে মাস শেষে একজন গ্রাহক গড়ে ১৫০ টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল দেন। প্রতিটি বাড়িতে এলইডি লাইট, সিলিং ফ্যান চালানোর সুবিধা দেওয়া হলেও চরবাসী এখন মোবাইল চার্জ দেন, টিভি চালান এমনকি কেউ কেউ ফ্রিজও ব্যবহার করছেন। একটি পরিবার সর্বোচ্চ ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
চরের বাসিন্দা মো. ফারুক মিয়ার সাড়ে ৬১ শতাংশ জমিতে সৌর পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ জমি এখনো খালি আছে। খালি জায়গা ও সৌর প্যানেলের নিচে সবজি চাষ করা হচ্ছে। চরের মাঝামাঝি হওয়ায় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে সুবিধার বিষয়টি মাথায় রেখে কর্তৃপক্ষ ফারুক মিয়ার জমিতেই সৌর পার্কটি স্থাপন করে। ফারুক মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই জমি ২০ বছরের জন্য ফেন্ডশিপ ও সামিট গ্রুপকে লিজ দিয়েছি। এখানে ২০০টি প্যানেল এবং ২০০ ব্যাটারি বসানো হয়েছে। আকাশে মেঘ করলে এবং বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় এ সৌর গ্রামে বিদ্যুতের সমস্যা হয়। এ সমস্যার সমাধান চান তারা।
চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাইবান্ধার এ চরের মতো আশপাশের আরও চার-পাঁচটি চরে এখন পর্যন্ত কোনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। ওইসব চরেও সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মানুষকে আলোকিত করা সম্ভব।
জানা গেছে, সৌর প্যানেল লাগানোর আগে এই কাবিলপুরের জমিতে নেপিয়ার ঘাস লাগানো হতো। শাকসবজি চাষ হতো। এখনো প্যানেলের নিচে জমিতে শাকসবজির চাষ হয়। এখন কর্তৃপক্ষ সৌর প্যানেলের নিচে এবং আশপাশে বেগুন, লালশাক, পুঁইশাক, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে এবং আমসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলের চাষ করছেন। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে এ জমিতে শাকসবজিও উৎপাদন হচ্ছে। জ্বালানি খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মো. জাকির হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশের চর এলাকাগুলোকে অবশ্যই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো যেতে পারে।