টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে গতকাল অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের বৃহত্তম জুমার নামাজের জামাত। এতে অংশ নিয়েছেন লাখো মুসল্লি। শুক্রবার দুপুর ১টা ৫১ মিনিটে জুমার নামাজের জামাত শুরু হয়ে ১টা ৫৬ মিনিটে শেষ হয়। এতে ইমামতি করেন বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়ের। এই পর্বে অংশগ্রহণ করছেন ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে শুরায়ি নেজাম তাবলিগের সাথীরা। ইজতেমা উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মুসল্লিদের সুবিধার্থে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
এদিকে দেশের বৃহত্তম জুমার নামাজে অংশ নিতে সকাল থেকেই ইজতেমা ময়দানের উদ্দেশে মুসল্লিদের ঢল নামে। ইজতেমায় অংশ নিতে না পারলেও দেশের বৃহত্তম জুমার নামাজের জামাতে অংশ নিতে ময়দানে উপস্থিত হন ঢাকা, গাজীপুর ও আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষ। জুমার নামাজে অংশ নিতে ময়দান ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক, মহাসড়ক, ফুটপাত ও বিভিন্ন অলিগলি মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
এদিকে ফজরের নামাজের পর বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা জিয়াউল হক। তাৎক্ষণিকভাবে তা বাংলায় তরজমা (অনুবাদ) করেন মাওলানা নুরুর রহমান। বেলা ১০টার দিকে খিত্তায় খিত্তায় তালিমের আমল হয়। তালিমের আগে মোজাকেরা (আলোচনা) করেন ভারতের মাওলানা জামাল। সকালে বয়ানের মিম্বরে শিক্ষকদের উদ্দেশে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ফারাহিম। ছাত্রদের সঙ্গে নামাজের মিম্বরে বয়ান করেন আলিগড়ের প্রফেসর আবদুল মান্নান। খাওয়াছদের (গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ) মাঝে টিনশেড মসজিদে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আকবর শরিফ। এ ছাড়া বাদ জুমা বয়ান করেন জর্ডানের শেখ উমর খাতিব, বাদ আসর বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়ের, বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আহমেদ লাট।
ইজতেমায় বিদেশি মেহমান : ইজতেমায় অংশ নিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন বিদেশি মুসল্লিরা। ইজতেমার মূল ময়দানের পশ্চিম-উত্তর প্রান্তে বিদেশিদের জন্য নির্ধারিত কামরায় উঠেছেন তারা। তাবলিগ জামাতের শুরায়ি নেজামের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান জানান, সকাল ১০টা পর্যন্ত বিশ্বের ৭২টি দেশের ২ হাজার ১৫০ জন বিদেশি মেহমান ময়দানে তাদের জন্য নির্ধারিত নিবাসে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ইজতেমার আরও পাঁচ দিন বাকি আছে। এ সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও বিদেশি মুসল্লি ইজতেমায় যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের ওজু, গোসল নির্বিঘ্ন করতে সরকারের সেবা প্রতিষ্ঠান ও ইজতেমার আয়োজক মুরব্বিরা তৎপর রয়েছেন। তাদের পছন্দের খাবারদাবার, থাকার ব্যবস্থা সুন্দর করে সম্পন্ন করা হয়েছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ড. নাজমুল করিম খান বলেন, ইজতেমা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাদের সিকিউরিটি নিয়ে মাঝেমধ্যে মেজারমেন্ট করে থাকেন। তারা তাদের মতো করে অ্যালার্ট জারি করে। কিন্তু মাঠে থেকে এখানে কী আছে, তা আমরা মেজারমেন্ট করে থাকি। আমাদের মনে হচ্ছে না যে, এখানে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে। আমরা এখনো শান্তিপূর্ণভাবে আছি। তারা যদি রেড অ্যালার্ট দিয়ে থাকে, তবে তা তাদের মেজারমেন্ট। এ বিষয়ে আমি জানি না। আমরা বিদেশি মেহমানদের দেখভাল করছি, তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছি। ইজতেমার ভলান্টিয়ার যারা আছেন, তারাও বাড়তি নিরাপত্তা দিচ্ছেন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ইজতেমা নির্বিঘ্ন করতে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পুরো ময়দানকে আলোকিত করা হয়েছে। বিদেশি মেহমানদের তাঁবুর জন্য দেড় হাজার বান ঢেউটিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমায় তিন মুসল্লির মৃত্যু : টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে এসে গতকাল তিন মুসল্লির মত্যু হয়েছে। এরা হলো আমিরুল ইসলাম (৪১) ও খুলনার ডুমুরিয়া বাজার এলাকার লোকমান হোসেন গাজীর ছেলে আবদুল কুদ্দুস গাজী (৬০)। সকাল ১১টায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি। অন্যজন হচ্ছেন- শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী থানা এলাকার আবদুল্লাহর ছেলে ছাবেত আলী (৭০)। ময়দানের ৪৬ নম্বর খিত্তায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ব ইজতেমার শুরায়ি নেজামের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান।
ইজতেমার আয়োজকরা জানান, বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলার আম বয়ানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ইজতেমার ৫৮তম জমায়েত শুরু হয়। শুরায়ে নেজামের প্রথম পর্বের তিন দিনের এই ইজতেমায় লাখো মুসল্লি অংশ নিয়েছেন। এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে দুই ধাপে। এর মধ্যে ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হবে প্রথম ধাপের ইজতেমা। এ ধাপে অংশগ্রহণ করবেন ৪১ জেলা ও ঢাকার একাংশের মুসল্লিরা। এরপর আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় ধাপের ইজতেমা। এ ধাপে অংশ নেবেন ২২ জেলা ও ঢাকার বাকি অংশের মুসল্লিরা। দুই ধাপের আখেরি মোনাজাত হবে যথাক্রমে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ও ৫ ফেব্রুয়ারি।