বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পাঁচ সাংবাদিক পরিবারকে ১ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল বিকালে রাজধানীর বসুন্ধরায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কনফারেন্স রুমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চেক দেওয়া হয়। কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবু তাহের, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ইয়াসিন রহমান পাভেল, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক মন্জুরুল ইসলাম, কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক লুৎফর রহমান হিমেল, নিউজ টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী সম্পাদক ফরিদুল ইসলামসহ অন্য সিনিয়র সাংবাদিকরা। শহীদ পাঁচ সাংবাদিক হলেন- অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা টাইমসের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হাসান মেহেদী, দ্য রিপোর্ট ডটলাইভের সাবেক ভিডিও জার্নালিস্ট তাহির জামান প্রিয়, দৈনিক ভোরের আওয়াজের গাজীপুরের গাছা থানা প্রতিনিধি শাকিল হোসেন, দৈনিক নয়া দিগন্তর সিলেট ব্যুরোপ্রধান আবু তাহের তুরাব ও দৈনিক খবরপত্রের প্রদীপ ভৌমিক (৫৫)।
৯ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শহীদ পাঁচ সাংবাদিক পরিবারকে সম্মাননা স্মারক এবং প্রত্যেককে ২ লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান শহীদ পাঁচ সাংবাদিক পরিবারকে ১ কোটি টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। গতকাল অনুদানের চেক পরিবারগুলোর হাতে হস্তান্তর করা হয়।
অনুষ্ঠানে কাদের গণি চৌধুরী বলেন, জুলাই বিপ্লবের সময় দেশ ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। গণতন্ত্র ছিল না। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। সব কিছু চলত এক ব্যক্তির ইচ্ছায়। জুলাই বিপ্লবের সময় কোনো দাবি তুললেই গুলি চালানো হয়েছে। সে সময় ঢাকার পিচের কালো রাস্তা ছাত্র-জনতা-সাংবাদিকের রক্তে লাল হতে দেখেছি। এমন বীভৎস চিত্র একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশে কল্পনাই করা যায় না। নিজ দেশের কোনো সরকারপ্রধান এমনটা করতে পারে, এটা কোনো সভ্য দেশে চিন্তাই করা যায় না। অনেকেই বলেছেন আজকে শহীদ পরিবারের জন্য দুঃখের দিন। আমি বলব গৌরবের দিন। বীরের মা, বাবা, ভাই, বোন বা সন্তান হওয়ার ভাগ্য সবার হয় না। আপনাদের সন্তানরা একটি জাতিকে রক্ষা করেছে। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শহীদ পরিবারের সবাইকে সালাম ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। দেশের জন্য যারা কাজ করেন তিনি সব সময় তাদের পাশে নীরবে দাঁড়ান। বসুন্ধরা গ্রুপ সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে। জুলাই বিপ্লবের শহীদরা আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছেন উল্লেখ করে কাদের গণি বলেন, গণমাধ্যম দেশ ও জনগণ ছাড়া আর কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। সংবাদপত্রে কোনো আপস হবে না। আমরা এখন থেকে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করব। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা অতীতের মতো আর কারও পেটডগের ভূমিকা পালন করবে না।
কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, আজকের এই আয়োজন কোনো আনন্দের নয়। এটি কষ্টের একই সঙ্গে শহীদদের পরিবারের জন্য এবং আমাদের জন্যও। বসুন্ধরা গ্রুপ এর আগেও হত্যার শিকার সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির ছেলের ভরণ-পোষণের জন্য ১৫ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছিল। পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী নিজে জুলাই ফাউন্ডেশনে ৫ কোটি টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। সেখান থেকেও এই শহীদ পরিবারগুলো সহায়তা পাবেন বলে আশা রাখি।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবু তাহের বলেন, কোনো মৃত্যুই নিরর্থক নয়। শহীদদের একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নই এখন আমাদের মূল কর্তব্য। আশা করি এ কর্তব্য থেকে আমরা বিচ্যুত হব না।
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ইয়াসিন রহমান পাভেল বলেন, শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আমরা বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে সব শহীদ ও আহতদের পাশে দাঁড়াব। শহীদ পরিবারের সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে, আপনাদের যে কোনো প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপ সব রকম মানবিক কাজে এগিয়ে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের এ আয়োজন। এ জন্য বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মহোদয়কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক লুৎফর রহমান হিমেল বলেন, এই শহীদ সাংবাদিকদের মধ্যে প্রিয় আমার অধীনেই চাকরি করেছিলেন। খুবই সাহসী এবং দায়িত্বের প্রতি অটল ছিলেন। বসুন্ধরা গ্রুপের এই মহৎ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
এ সময় শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসিয়ানা জাহান বলেন, আমাদের সন্তানেরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে। শহীদ পরিবারগুলোর পাশে ছাঁয়া হয়ে দাঁড়ানোয় বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। যে অর্থ আপনারা না চাইতেই দিয়েছেন, সে জন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার ছেলের পাঁচ বছরের ছোট একটা মেয়ে আছে। দোয়া করবেন, এ অর্থ যেন আমি তার জন্য সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে পারি।
হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি বলেন, আমার স্বামী মারা যাওয়ার ৩০ মিনিট আগেও ফোনে কথা হয়। অনেক আওয়াজ শুনে আমি তাকে ঝামেলা থেকে সরে যেতে বলেছিলাম। সে বলেছিল, ‘এটা আমার দায়িত্ব, আমি যেতে পারব না।’ আমার ছোট দুটি মেয়ে। এই সহায়তা ওদের বড় করতে কাজে আসবে।
শাকিল হোসেনের বাবা বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপ যেভাবে শহীদ পরিবারের দুঃখ-বেদনার পাশে দাঁড়িয়েছে, তার কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান একজন দানবীর হিসেবে পরিচিত। তিনি যেন সব সময় সব বিপদগ্রস্তের পাশে থাকতে পারেন।