দেশে বড় কোনো অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। স্বাভাবিক সময়ে অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না নগর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত সংস্থাগুলো। এমনকি ভবনমালিক ও ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। ফলে চট্টগ্রামে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি কোনোভাবেই কমছে না।
অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ে একাধিক জরিপ করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে করা এক জরিপ অনুযায়ী, নগরীতে অন্তত ১৮ হাজার ৫০০টি বহুতল ভবন আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ১০০টি ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। ১ হাজার ৭৫০টি অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি ১ হাজার ৩৫০টির ঝুঁকির পরিমাণ কিছুটা কম।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ভবনমালিক ও তদারকি সংস্থাগুলোতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। যেসব মার্কেটে সরু গলি ও ঘিঞ্জি পরিবেশ বিরাজ করছে সেগুলো প্রশস্ত করাসহ নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে। কিন্তু এসব তদারকি সংস্থার পক্ষ থেকে সন্তোষজনক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রামের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মালিকদের চিঠি দিই। বিভিন্ন সময়ে তদারকি সংস্থাগুলোকেও জানিয়েছি। এ ছাড়া দোকান মালিক সমিতি, ব্যবসায়ী সমিতির মাঝেও বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করি। বিভিন্ন সময়ে মহড়াও করি। কিন্তু স্টেকহোল্ডারদের তৎপরতা কম দেখা যায়। অগ্নিঝুঁকি কমাতে সবার আগে ভবনমালিকদের সচেতন হওয়া জরুরি।’ এদিকে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, নগর ও নগরীর বাইরে অন্তত ৫৪টি মার্কেট, ২৪টি কনটেইনার ডিপোসহ সীতাকুন্ড ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্ট কারখানাও অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। গত কয়েক বছরে কনটেইনার ডিপো, অক্সিজেন প্ল্যান্টে আগুন লেগে অন্তত ৫৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ ছাড়াও চট্টগ্রামের জনবহুল জহুর হকার মার্কেট, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তামাককুমুন্ডি লেন, খাতুনগঞ্জের মতো জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকাও রয়েছে। এসব এলাকার ব্যবসায়ী সমিতি ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দিলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর রেয়াজউদ্দিন বাজারে ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ২০টির মতো গলি রয়েছে। যেগুলোর বেশির ভাগই সরু প্রকৃতির। পার্শ্ববর্তী তামাককুমুন্ডি লেনসহ এই এলাকার তিন শতাধিক বাণিজ্যিক ভবনে ১৮০টি মার্কেট রয়েছে। যেগুলো বেশির ভাগই পুরনো ভবনে তৈরি করা হয়েছে। এসব মার্কেটে প্রতিদিন লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়। বিভিন্ন সময়ে এই বাজারের ভেতরে অগ্নিকান্ডে বিপুল ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। এরপরও টনক নড়ে না ভবনমালিক ও ব্যবসায়ীদের।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিঝুঁকিতে থাকা চট্টগ্রাম নগরীর ৫৪টি মার্কেটে বারবার নোটিস পাঠিয়েও কোনো পরিবর্তন আনা যায়নি। এসব মার্কেটের কিছু কিছুতে প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণের সামগ্রী থাকলেও আধুনিক ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই। আগুন লাগলে সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভিতরে নেওয়ার উপায় নেই। নেই পানির উৎসও। পুরনো ভবনগুলোতে নেই ফায়ার সেফটি প্ল্যান। ফলে এসব মার্কেটে আগুন লাগলে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা থেকেই যায়।
এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অগ্নিঝুঁকি কমাতে যে অর্থ ব্যয় হয় সেটাকে অনেকে অপচয় মনে করে। এ কারণে বারবার সতর্ক করার পরও তারা অগ্নিঝুঁকি কমাতে মনোযোগ দেন না। সবারই বোঝা উচিত নিজের বিনিয়োগ ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণে পর্যাপ্ত এক্সটিংগুইশার সংগ্রহে রাখা উচিত।’
এ ব্যাপারে জানতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমকে ফোন করলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।