রংপুরের চার নদনদী মানস, ঘাঘট, বুড়াইল ও শালমারা। একসময় এসব নদনদীর বুক চিড়ে চলাচল করত পাল তোলা নৌকা। নদনদীগুলোর খেয়াঘাট ঘিরে ছিল জমজমাট ব্যবসাবাণিজ্য। নদীবন্দর ঘিরে মানুষের পদচারণে মুখর থাকত। এখন সেসব কেবল অতীত। দখল-দূষণের কারণে এ চার নদনদী অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন, খরা মৌসুমে তীব্র খরা আবার শীত মৌসুমে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে নদনদীগুলো। কম বৃষ্টিপাত ও খরা মৌসুমে অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। সেই সঙ্গে নদনদীগুলোর শুকিয়ে থাকা জায়গা দখল করে গড়ে উঠছে বসতি এবং ফসলের খেত। এ অবস্থায় অনেক স্থানে এসব নদনদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। একসময় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর, সদর উপজেলা, কাউনিয়া ও পীরগাছায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃতি ছিল মানস নদের। এ নদের এখন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। জমির বুক চিড়ে বেরিয়ে এসেছে হাজার হাজার একর আবাদি জমি। নৌকার পরিবর্তে সেখানে চলছে এখন কলের লাঙল। চার দশক আগেও মানস নদে নৌকা চলেছে পাল তুলে। হাজার হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। মানস নদে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৫০টির মতো খেয়াঘাট ছিল, যা এখন কেবল স্মৃতি।
কাউনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় কৃষকরা বোরো ধান চাষ করার জন্য মানস নদজুড়ে ধানের বীজতলা তৈরি করেছেন। টেপামধুপুর লালমসজিদ এলাকার কৃষক মো. আমিন জানান, মানস নদে এবার খুব সহজেই বীজতলা তৈরি করা গেছে। কৃষক শফিকুল জানান, নদে পানি কম এবং কাদা থাকায় তেমন কোনো খরচ ছাড়াই বীজতলা তৈরি করা গেছে। তাদের মতো অনেকেই নদের বুকে চাষাবাদ করছেন।
কাউনিয়ার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও লেখক রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একসময় মানসের বুক চিড়ে বারোমাস নৌকা চলত। এখন মানস নদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একই অবস্থা ঘাঘট নদের। শহরের অদূরে ঘাঘটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল নদীবন্দর। ঘাঘট নদের ওপর দিয়ে অনেক স্থানেই ব্রিজ হয়েছে। উন্নয়নের নামে অনেক স্থান দখল হয়েছে। ঘাঘটের বুকে অনেক স্থানে গড়ে উঠেছে ইমারত। একই অবস্থা বুড়াইল, শালমারার। এগুলোর বুকে জেগে ওঠা চর দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি ও ফসলের খেত। চার নদীর দূরবস্থা সম্পর্কে রিভারাইন পিপলের পরিচালক, নদীবিষয়ক গবেষক ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদনদীগুলোতে শত শত অবৈধ দখলদার রয়েছে। দখলদারদের উচ্ছেদ ও নদনদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।