ভেজাল, নকল আর মানহীন পণ্যে সয়লাব বাজার। প্রসিদ্ধ ব্র্যান্ডের মোড়ক নকল করে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল পণ্য। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ‘পরীক্ষামূলক’ বার্তা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত মশার কয়েল। নকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কারণে হামেশা ঘটছে অগ্নিদুর্ঘটনা। ফরসা হওয়ার ক্রিম ব্যবহার করে ঝলসে যাচ্ছে চামড়া। মেছতা পড়ছে ত্বকে। বড় বড় সুপার শপেও দেশিবিদেশি শীর্ষ সারির ব্র্যান্ডের নকল শ্যাম্পু-তেল-পারফিউম বিক্রি হচ্ছে কোনোরকম নিরাপত্তা সিল ছাড়াই। খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রং ও রাসায়নিক। নিষ্পাপ শিশুর খাদ্যেও মেশানো হচ্ছে ভেজাল। ঘটছে অপমৃত্যু। বাড়ছে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা। দিনের পর দিন প্রকাশ্যে এমন অনিয়ম চললেও সরকারের তদারকি সংস্থাগুলো যেন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে নেই কোনো তদারকি বা বাজার মনিটরিং।
পণ্যের মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নামকাওয়াস্তে ভেজালবিরোধী অভিযান চালালেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, বাজারে ভেজাল পণ্য রোধের চেয়ে লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন নিয়েই বেশি ব্যস্ত বিএসটিআই কর্মীরা। ফলে বিএসটিআই থেকে অনুমোদন নেওয়ার পর বাজারে পণ্যের মান বজায় রাখছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। সেগুলো যাচাই হচ্ছে না। গলির মধ্যে কোনো বাসাবাড়ির অন্ধকার ঘরে তৈরি পণ্যে বিএসটিআইয়ের লোগো বসিয়ে বিক্রি হচ্ছে নকল ও ভেজাল পণ্য। দেখার কেউ নেই! ক্ষতিকর অনেক পণ্য নিষিদ্ধ করেই দায় সেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাজারে এগুলো বিক্রি বন্ধে নেই কোনো উদ্যোগ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু মানুষের মানসিকতা না বদলালে ভেজাল ঠেকানো কঠিন। ঢাকা শহরেই প্রতিদিন তিন-চারটি টিম অভিযান চালায়। সারা দেশেই অভিযান চলে। কর্মকর্তারা ফিরে এলে আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। এ ছাড়া অনেক নকল পণ্যে যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, সে ঠিকানায় গিয়ে কিছু পাওয়া যায় না। এ সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সবাই মিলে ভেজাল প্রতিহত না করলে এত বড় বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ ছাড়া আমরা শুধু আমাদের তালিকাভুক্ত বাধ্যতামূলক পণ্যগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারি।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খাদ্যপণ্য, ভোজ্য তেল, মশার কয়েল, পশুখাদ্য, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, শিশুখাদ্য, বেকারি পণ্য, খাবার পানি, প্রসাধনী, জ্বালানি তেল থেকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সবকিছু নকল হচ্ছে। মেশানো হচ্ছে ভেজাল। কিটক্যাট, লাভ ক্যান্ডি, রোলানা, সাফারি, ফাইভ স্টার, ক্যাডবেরিসহ বিশ্বখ্যাত নানা ব্র্যান্ডের চকলেট তৈরি হচ্ছে কেরানীগঞ্জের জিনজিরার টিনশেড ঘরে। ক্ষতিকর এসব নকল চকলেট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে। তৈরি হচ্ছে জনসন অ্যান্ড জনসন, পন্ডস, কডোমোসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ডের কসমেটিকস, বিদেশি পাউডার ড্রিঙ্কস, জুস, চিপস, ডায়াপারসহ বিভিন্ন পণ্যের নকল। নামকরা অনেক ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু, তেল, প্রসাধনীর বোতলে নেই নিরাপত্তা সিল। চাইলে মুখ খুলে ব্যবহার করে নকল পণ্য ভরে বিক্রি করা যাচ্ছে। আটায় মেশানো হচ্ছে চক পাউডার। মিষ্টিজাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত রং, সোডা, স্যাকারিন ও মোম। কাপড়ের বিষাক্ত রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া মেশানো হচ্ছে মসলায়। ফলমূল দ্রুত পাকাতে কার্বাইড, ইথোফেন আর পচন রোধে ফরমালিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিপজ্জনক মাত্রায় পারদ ও হাইড্রোকুইনোন পাওয়ায় ২০২২ সালে ১৭টি রং ফরসাকারী ক্রিম বিক্রি নিষিদ্ধ করে বিএসটিআই। একই ক্রিম পরের বছর আবারও নিষিদ্ধ করা হয়। এখনো ক্রিমগুলো বিভিন্ন সেলুনে ব্যবহার হচ্ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-এর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর দেশে ৩ লাখ লোক ক্যান্সারে, ২ লাখ লোক কিডনি রোগে, দেড় লাখ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে। অথচ ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদে র বিধানও রয়েছে। তবে এ অপরাধে বড় সাজার নজির দেশে নেই।