প্রশাসনের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চায় না জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আমলাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। তাই স্বাধীন প্রশাসন গড়ে তুলতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের সুপারিশ করবে কমিশন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কমিশন রিপোর্ট তৈরি করছে। কাজ শেষ পর্যায়ে। নিরপেক্ষ প্রশাসন করতে আমরা কী কী প্রস্তাব দেব তা জমা দেওয়ার পর সবাই জানতে পারবে।
গণমুখী, জবাবদিহিতামূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন গড়তে গত ৩ অক্টোবর আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কয়েক দফা এই কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়ার মেয়াদ বাড়ানো হয়। নাম প্রকাশ না করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারি করতেন রাজনৈতিক নেতারা। তারা পছন্দের কর্মকর্তাদের নিজের এলাকায় পদায়ন করতেন এবং তাদের মাধ্যমেই অনিয়ম করতেন। তাই রাজনৈতিক খবরদারি না থাকলে অনিয়মও কমবে বলে আশা কমিশনের। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে জনমুখী করতে সুপারিশ করা হবে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সফর করে অংশীজনদের মতামত নিতে ২০টির বেশি সভা করেছে কমিশন। এ ছাড়া সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লক্ষাধিক মানুষের মতামতও এসেছে কমিশনে। অংশীজনদের মতামত ও পরামর্শ নিয়েই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করছে সংস্কার কমিশন। জনপ্রশাসনে শুধু মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলির সুপারিশ করা হবে, কোনো তদবির বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলবে না। এ ছাড়া দুর্নীতি বন্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বিভিন্ন সুপারিশও থাকবে। অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়ানো কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির বিষয়েও সুপারিশ করবে কমিশন। দক্ষ কর্মকর্তা তৈরিতে দেশে-বিদেশে অধিক প্রশিক্ষণের বিষয়েও জোর দিচ্ছে কমিশন। একাধিক সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে সরকারি সেবা সহজ করা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্ব থাকবে। কাজের কেন্দ্রস্থল যেন কেবলই সচিবালয়মুখী না হয় সে সুপারিশও থাকবে। উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদে পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি এবং উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ সুপারিশ করা হবে বলে কমিশন প্রধান আগে যে তথ্য দিয়েছিলেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তার বড় সংশোধন আসতে যাচ্ছে বলেও জানা গেছে। তবে টপপর্যায়ে পদগুলোতে যেন মেধাবীরা যেতে পারেন তা নিশ্চিত করার সুপারিশ থাকবে। পিএসসি থেকে সকল পর্যায়ে কেবলই মেধার গুরুত্ব দেওয়া হবে। কমিশনের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, নাগরিক সেবা এবং মেধা এই দুটো বিষয়কে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমলাতন্ত্রে মানুষ যেন হয়রানি না হয়, সবাই সহজ সেবা পায়। চাকরিজীবীদের মধ্যে যে বৈষম্যের কথা বলা হয় সেখানে ন্যায়বিচারের সুপারিশ থাকবে। জনপ্রশাসনকে আরও জনবান্ধব করা, জবাবদিহিতা বাড়ানো, নিরপেক্ষ হওয়ার প্রস্তাবনা থাকবে। নাম প্রকাশ না করে কমিশনের একজন সদস্য বলেন, অতীতে দেখা গেছে, বড় বড় অনিয়মেও অনেক কর্মকর্তা শাস্তি পাননি বা কম পেয়েছেন। এবার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রথম পর্যায়ে গঠন করা ছয় কমিশনের মধ্যে চার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।