ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে হয়েছে অবনতি, দূরত্ব বেড়েছে অনেক। স্কুল থেকে শুরু করে মাদরাসা, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এখন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকারের নীতিমালার কারণে ছাত্রদের শারীরিক বা মানসিক শাস্তির আওতায় আনার চিন্তা শিক্ষকদের বাদ দিতে হয়েছে অনেক আগেই। শিক্ষকরা এখন শুধু রুটিনমাফিক ক্লাস নেন। শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আগের মতো আবেগ-দরদ নিয়ে পাঠদানও করেন না, শাসন করেন না। অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে ভয়ে এখন ধমকও দেন না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর ছাত্র-শিক্ষকের এই সম্পর্কে দূরত্ব আরও বেড়েছে যোজন যোজন।
জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থানে ছাত্ররা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের একপর্যায়ে মুখে পতন হয়েছে স্বৈরাচার সরকারের। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শাখা-প্রশাখা প্রসারিত হয়েছে সারা দেশে। অনেকে ছাত্রদের এ প্ল্যাটফরমের স্বঘোষিত নেতা বনে গেছেন! দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হঠাৎ করে উদয় হয়েছে এমন অনেকে, যারা পড়ালেখা বাদ দিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়েছিলেন। তাদের অনেকেও পরিচয় দিচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে। ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফরমটির বিভিন্ন কমিটিতে ঢুকে নানা অপরাধে জড়াচ্ছেন অনেক কোমলমতিরাও।
সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় অনেক শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির তথ্যমতে, সবমিলে দুই হাজার শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। আর এই পদত্যাগের সঙ্গে সিংহভাগেই জড়িত ছিলেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান বা প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন স্থানে ছাত্রছাত্রীরা টেনেহিঁচড়ে, মারধর করে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেন পদত্যাগপত্রে। এ কারণেও শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের দূরত্ব বেড়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রছাত্রীরা এখন আর ক্লাসে তেমন মনোযোগী নন, নামেমাত্র বাধ্য হয়ে ক্লাস নেন শিক্ষকরা। অনেক শিক্ষকের মধ্যে এখন কাজ করছে ছাত্রভীতি। আর এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত পাঠদানে ধস নেমেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বিরাজ করছে একই পরিবেশ।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেখ কাওছার আহমেদ বলেন, যে সমাজে শিক্ষার্থীদের শাসন করার ব্যবস্থা থাকবে না, সেখানে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও থাকবে না। শাস্তির ব্যবস্থা বা কোনো জবাবদিহিতা না থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শৃঙ্খলার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। মানবিকতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য শাসনব্যবস্থা ফিরে আসা দরকার। তাহলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন হবে। আর এতে শিক্ষকদের পাঠেও মনোযোগ বাড়বে বলে মনে করি। এ শিক্ষকনেতা মনে করেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচার সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহার করে বিভিন্ন স্বার্থ হাসিল করেছে একটি পক্ষ। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন করা গেলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অপব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হবে।
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ছাত্ররা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করেছেন। যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, আন্দোলন করেছে- তাদের অনেকের মধ্যে ক্ষমতার প্রভাব এসেছে। যাদের মধ্যে ক্ষমতার প্রভাব এসেছে তারা অহংকারী হয়ে উঠেছেন। ছাত্র আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের এখন বড় কর্তব্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনতে হবে। এটি করা সম্ভব না হলে অনেক বড় ক্ষতি হবে আমাদের। সম্প্রতি অনেক স্থানে শিক্ষকরা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এটিও অনাকাঙ্ক্ষিত, মেনে নেওয়া যায় না।
এ শিক্ষাবিদ বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে। রাষ্ট্রকে এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র এটি নিয়ে আগেও গুরুত্ব দেয়নি, বর্তমানে দিচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ, যারা রাষ্ট্রের শাসক তাদের সন্তান সাধারণ ধারায় পড়ান না। সম্ভব হলে বিদেশে পড়ানোর চেষ্টা করেন। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।