দেশের ৯৯২টি জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কে অন্তত ২৭৫টি স্থায়ী, অস্থায়ী এবং অবৈধ হাটবাজার গড়ে উঠেছে। এসব হাটবাজার ঘিরে পণ্য পরিবহন, থ্রি-হুইলারের চলাচল, বাস-ট্রাকস্ট্যান্ড ও মানুষের চলাফেরা কমাচ্ছে গাড়ির গতি। যত্রতত্র মানুষের রাস্তা পারাপারে ঘটছে দুর্ঘটনা, মারা যাচ্ছে মানুষ। কিন্তু গত বছরের ১৬ জানুয়ারি নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অবৈধ হাটবাজার, স্থাপনা ও পার্কিং অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। এরই মধ্যে এক বছর পার হলেও হাই কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।
জানা গেছে, কুমিল্লা অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, কুমিল্লা-নোয়াখালী, নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের ৬৯টি হাটবাজারের মধ্যে ৫৮টি স্থায়ী ও ১১টি অস্থায়ী বাজার রয়েছে। গাজীপুর অঞ্চলের ঢাকা-ময়মনসিংহ, গাজীপুর-টাঙ্গাইল, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-সিলেট ও ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে রয়েছে ৪১টি বাজার। বগুড়া অঞ্চলে হাটিকুমরুল-ঢাকা, হাটিকুমরুল-বগুড়া, সিরাজগঞ্জ-নাটোর, কাশিনাথপুর-হাটিকুমরুল, বগুড়া-নাটোর, পাবনা-নাটোর, সিরাজগঞ্জ-নাটোর, বনপাড়া-রাজশাহী, নাটোর-কুষ্টিয়া, রংপুর-বগুড়া, রংপুর-সৈয়দপুর, রংপুর-ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও, রংপুর-বালিয়াডাঙ্গা, বাংলাবান্ধা-পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কে রয়েছে ৬১টি হাটবাজার। এ ছাড়া মাদারীপুর অঞ্চলে রয়েছে মোট ২৯টি হাটবাজার। এসব বাজার খুলনা-সাতক্ষীরা, নড়াইল-যশোর, ঢাকা-কুষ্টিয়া-দৌলতদিয়া, ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ও কুষ্টিয়া-দৌলতদিয়া, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ, খুলনা-মোংলা, যশোর-বেনাপোল ও ঢাকা-গোপালগঞ্জ মহাসড়কের পাশে রয়েছে। আর সিলেট অঞ্চলে মহাসড়কের পাশে রয়েছে ৭৫টি বাজার।
বিদ্যমান সাংঘর্ষিক আইনে অপসারণের কাজটি চ্যালেঞ্জিং
প্রধান প্রকৌশলী, সওজ অধিদপ্তর
২০২১ সালের মহাসড়ক আইন অনুযায়ী, সড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার কিংবা স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা দণ্ডনীয় অপরাধ। এজন্য অনূর্ধ্ব দুই বছরের কারাদ বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদে র বিধান রয়েছে। আইনটি প্রয়োগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কের আশপাশের হাট-বাজার ও অবৈধ অবকাঠামো অপসারণও করেন। তবে প্রকৌশলীদের অভিযোগ, অপসারণের মাস খানেকের মধ্যে পুনরায় এ ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠে। আর সেটিও হয় ‘আইনসিদ্ধভাবেই’। কারণ ২০২৩ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইনের বিধান অনুযায়ী, দেশের যে কোনো স্থানে হাট ও বাজার স্থাপন করতে পারে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সড়ক আইন ও হাটবাজার আইনের মধ্যকার সাংঘর্ষিক ধারার কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়ক থেকে হাট-বাজার অপসারণের কাজটি চ্যালেঞ্জিং বলে জানিয়েছেন সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। সম্প্রতি এক সভায় তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সীমারেখার মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা করা যাবে না। অন্যদিকে হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩-এ বলা হয়েছে, যিনি ইজারা দেবেন, ডিসি অফিস বা অন্য কেউ, ওনারা যে কোনো স্থানে হাট-বাজার স্থাপন করতে পারবেন। এটা আমাদের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, হাইওয়ে নাম থেকেই বোঝা যায় এটি হবে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের ধমনি রোড। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোয় হাটবাজারের মতো ব্লক তৈরি হচ্ছে। একটা সময়ে স্থানীয় মানুষ এ ব্লকগুলো তৈরি করত। কিন্তু এখন দেখছি, স্থানীয় সরকার প্রশাসন বলে দিয়েছে যে, স্থানীয় প্রশাসন যেন স্বনির্ভর হয়। এতে সংশ্লিষ্ট ইউএনওরা লিজ মানি পাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তার পাশে যারা ব্যক্তি উদ্যোগে মার্কেট করতে চায় সেগুলোর ‘পেরিফেরি ডিক্লেয়ার’ করে দিচ্ছে। মার্কেট একবার বসে গেলে সেটা আর সরানো যায় না।