বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় আলোকবর্তিকা হয়ে আছে পুরান ঢাকার আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাইস্কুল। ১২০ বছর ধরে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে রাজধানীর এই প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ। তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলায় ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যে বিদ্যালয়ের, তা দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে আজও। আর্মেনিয়ানদের স্মৃতিবিজড়িত এ স্কুলটি প্রায় আড়াই একর জমির ওপর তৎকালীন ব্রিটিশ স্থাপত্যশিল্পের আদলে নির্মাণ করা হয়। প্রধান ফটক পেরিয়ে সুবিশাল ময়দানের পরই দৃষ্টিনন্দন লাল ইটের গাঁথুনিতে তৈরি স্কুল ভবন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টির প্রাচীন কাঠের সিঁড়ি, গ্যালারি, লাইব্রেরি ও ছায়াদায়ী দেবদারুগাছ আজও বিদ্যমান।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত আরমানিটোলা হাইস্কুল তৈরি করেছে লক্ষাধিক শিক্ষাবিদ, আমলা, প্রকৌশলী, সামরিক অফিসার, ক্রীড়াব্যক্তিত্ব, চিকিৎসক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী প্রভৃতি। এদের মধ্যে শুধু দেশবরেণ্য ব্যক্তি নয়, বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিবর্গও রয়েছেন। রয়েছেন বিশ্বভারতীর সাবেক উপাচার্য অম্লান দত্ত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি এফআর খান, প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ আবদুস সাদেক, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রথিতযশা শিল্পপতি আহমেদ আকবর সোবহানের মতো সফল মানুষ। প্রসিদ্ধ এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্রীড়া জগতেও অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
বিদ্যালয়টিতে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বর্তমানে ২ সহস্রাধিক ছাত্র রয়েছে এখানে। আগামীকাল ১৬ জানুয়ারি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এ স্কুলের ১২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
ইন্দো-সারসেনিক ও ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যকলার অপূর্ব সমন্বয়ের ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যাপীঠের দুই লাল দালানের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের ভাইসরয় জর্জ নাথানিয়েল কার্জন। ১৯০৪ সালে তিনি মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এডুকেশন পলিসি প্রকাশ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় একই বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি কার্জন হল প্রাঙ্গণে সুধী সমাবেশের মাধ্যমে দুই লাল দালানের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি। নির্মাণ শেষ হয় ১৯০৮ সালে। ১৯০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও তার প্রাকটিসিং স্কুল আরমানিটোলা। এটি পরবর্তীতে আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাই স্কুল নামে অভিহিত হয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে স্কুলটি মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে আসছে। বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এমনকি চব্বিশের গণ আন্দোলনেও আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
আরমানিটোলা স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন জে ই হুইটেকার। শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যে নয়, মানসম্মত পাঠদানেও ১২০ বর্ষী এ বিদ্যালয়ের অর্জন প্রশংসনীয়। ১৯৫৭ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানে সেরা স্কুলের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিল স্কুলটি। দেশ স্বাধীনের পরও ধরে রেখেছে এ অর্জন। ১৯৯৬ সালে জাতীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ স্কুলের মর্যাদা পায় আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাই স্কুল।
এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা বেশ কয়েকজন খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। এদের মধ্যে অন্যতম এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) সুলতান মাহমুদ বীরউত্তম, লে. জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী বীরউত্তম, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীরউত্তম, ব্রিগেডিয়ার (অব.) মহসিন উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, মেজর (অব.) মেহেদী আলী ইমাম বীরবিক্রম।
শিক্ষা-সাহিত্য, রাজনীতি, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন পেশায় সফল অনেকেই এ বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন ছাত্র। প্রাক্তনীদের মধ্যে জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, বুয়েটের সাবেক উপাচার্য ড. শাহজাহান, শিক্ষাবিদ ড. আবদুল মোমিন চৌধুরী, ভারত সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অশোক মিত্র, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, কবি আসাদ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, মাসুদ রানা সিরিজের লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন, চিত্রনায়ক জসিমসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তির দ্যুতিতে আজও দীপ্যমান ১২০ বছরের বর্ণাঢ্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধিকারী আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাই স্কুল।
প্রসিদ্ধ এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্রীড়া জগতেও অসামান্য অবদান রেখে আসছে। আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাই স্কুলকে বাংলাদেশের হকির সূতিকাগার বলা যায়। দেশের হকির প্রায় সব বরেণ্য খেলোয়াড় আরমানিটোলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। তাদের মধ্যে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন অনেকেই রয়েছেন। এমন খেলোয়াড়ের মধ্যে রয়েছেন- আবদুস সাদেক, মাহমুদুর রহমান মোমিন, বশীর আহমেদ, প্রতাপ হাজরা, সাব্বির ইউসুফ, আবদুস সালাম, খাজা ইউসুফ রেজা, হোসেন ইমাম চৌধুরী শান্টা, জামাল হায়দার প্রমুখ।
মোগল আমলে পুরাতন ঢাকায় আর্মেনিয়ানদের আগমন ঘটে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই আরমেনীয় ব্যবসায়ীরা এখানে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের আবাসস্থান ও গির্জা গড়ে তোলেন। আরমেনীয়দের নামানুসারেই আরমানিটোলার নামকরণ করা হয়। বিংশ শতাব্দীতে ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য স্কুলগুলোও অলিখিতভাবে নির্দিষ্ট হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আরমানিটোলা স্কুলের ব্যতিক্রম ছিল। ঘোর সাম্প্রদায়িকতার দিনেও সব সম্প্রদায়ের ছাত্ররা এ স্কুলে এক সঙ্গে লেখাপড়া করেছে। সেই সময় আরমানিটোলায় বিভিন্ন ব্রাহ্ম সমাজ ও ব্রাহ্ম মন্দির এবং পূর্ব বাংলার বিখ্যাত কয়েকটি মুসলিম ও হিন্দু জমিদার বাড়ির অবস্থানের কারণে এটি ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বা অভিজাত এলাকা ছিল। শুধু সৌন্দর্য, বিশালত্ব এবং শিক্ষা-দীক্ষায় নয়, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি অঙ্গনেও বিদ্যালয়টির যে ঐতিহ্য তা আজও বিদ্যমান।
প্রধান শিক্ষকের শুভেচ্ছা : বিদ্যালয়ের ১২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুন নাহার। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যাপীঠ অনেক গুণী ব্যক্তি তৈরি করেছে। এদের মধ্যে শুধু দেশবরেণ্য ব্যক্তি নয়, বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিও রয়েছেন। স্কুলে বেশকিছু সমস্যা রয়েছে যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সমাধানের চেষ্টা চলছে।