দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর বেশির ভাগই স্বামীর মাধ্যমে। কেউ কেউ যৌতুকের জন্য। অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন নির্যাতনে। পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর দায়িত্বশীল সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৭৪৮ জন নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তাদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। পুলিশ সদস্যরা তাদের তাৎক্ষণিক সাহায্য করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী ৩ হাজার ৮৪৭ জন শুধু তার স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশের সাহায্য নেন। যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হন ৪৩৬ জন। ৪৬৫ জন তাদের অভিভাবক ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের মাধ্যমে নির্যাতিত হয়ে ৯৯৯-এ ফোন দেন এবং পুলিশের সাহায্য নেন।
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতি বছরই নারীদের পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যৌতুকের জন্য সহিংসতার শিকার হন। এ ছাড়া স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের বাধ্য না হওয়া, স্বামীর পরকীয়া ও মাদক গ্রহণে বাধা দেওয়ার মতো কারণেও তারা নির্যাতনের শিকার হন। আগে নারীরা ঘরে নির্যাতনের শিকার হলে সে ঘটনাগুলো সামনে কম আসত। কিন্তু এখন গভীর রাতেও ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য চাইছেন। আগে পারিবারিক বা সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে আগে একজন নারী চাইলেই থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে পারতেন না; কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহজলভ্য হওয়ায় এবং ৯৯৯-এর মতো সেবা চালু হওয়ায় তারা নির্যাতনের ঘটনা পুলিশকে জানিয়ে সাহায্য চাইছেন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর পুলিশ পরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন) আনোয়ার সাত্তার গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের কাছে গত বছর ২৩ হাজারের বেশি ফোনকল আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল পারিবারিক সহিংসতা-সংক্রান্ত কল। আমাদের সেবা প্রদানের দায়িত্ব থেকে গত বছর নারীদের কাছ থেকে পারিবারিক নির্যাতনের জন্য ৯৯৯-এ ফোনকলের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক সেবা প্রদান করা হয়েছে। দেখা যায় যে, নির্যাতিত নারীরা আইনি ঝামেলা এড়াতে নির্যাতিত হওয়ার পর মামলা করতে আগ্রহী নন। এসব ক্ষেত্রে পুলিশ গিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে তাদের প্রাথমিক সেবা দিয়েছে।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যে, ২০২৪ সালে পারিবারিক সহিংসতায় ৫২৩ জন নারী নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন ৩৩ জন। শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার হন ১১ জন। ১৮০ জন নারীকে তার স্বামী হত্যা করে। ৪০ জনকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন হত্যা করে। ৫৮ জন নিজের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে হত্যার শিকার হন। ২৭ জনকে নিজের পরিবারের লোকেরা নির্যাতন করে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে ১৭৪ জন নারী আত্মহত্যা করেন। এসব ঘটনায় ২১১টি মামলা করা হয়। পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের কেউ কেউ সংসারের শুরুতেই বিবাহ বিচ্ছেদে যান। আবার কেউ সামাজিকতা ও মা-বাবার চাপে নির্যাতন সয়ে সংসার করেন। সংসার করতে গিয়ে ভুক্তভোগী এই নারীরা স্বামী তো বটেই স্বামীর মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেন। এ ক্ষেত্রে কর্মজীবী নারীদের কারও কারও নিজ উপার্জনের অর্থ ব্যয়ের স্বাধীনতাও থাকে না। এই অর্থ তাদের স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের দিতে হয়। এই নারীদের অনেকেই দাম্পত্য কলহের জেরে হত্যার শিকার হন।