ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অভ্যন্তরের নানান রকম সংস্কার কার্যক্রমের কারণে চাপা পড়ছে রোহিঙ্গা ইস্যু। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা সামাল দিতে ব্যস্ততা বেড়েছে সরকারের। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারছেন না তারা। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুর ভিড়ে উন্নয়ন সহযোগীদের মনোযোগও সরে গেছে রোহিঙ্গা অর্থায়ন এবং প্রত্যাবাসন ইস্যু থেকে। বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দিয়ে এক বছরের বেশি সময় আগ থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও অন্য বিদেশি সংস্থাগুলো। এ ছাড়া বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা নাগরিকদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনাও প্রায় বন্ধ। এর আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে চিঠি চালাচালি আর বিভিন্ন বৈঠক হলেও গত ৫ আগস্টের পর সেসব কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ। যার ফলে অনিশ্চয়তা বাড়ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থবিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে রোহিঙ্গাদের যে আন্তর্জাতিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, গত বছর দুই ধাপে তা কমানো হয়েছে। যা এখন প্রতি মাসে মাথাপিছু ৮ ডলারে নেমে এসেছে। সহায়তার এ হার আরও কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খাদ্য বরাদ্দ কমানোর ফলে রোহিঙ্গাদের সার্বিক দুর্গতি ও অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ খাতে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব ব্যয়ও বেড়েছে। যার একটা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয়দের মাঝেও। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি খাদ্যসহায়তা কমিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘও। এ কারণে অর্থসংকটে পড়েছেন রোহিঙ্গারা। জানা যায়, গত বছর ডব্লিউএফপি দুই দফা কমিয়েছে অর্থ বরাদ্দ। গত বছরের মার্চে রোহিঙ্গাদের জনপ্রতি মাসিক বরাদ্দ ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ১০ ডলার করা হয়। গত ১ জুন থেকে ওই বরাদ্দ আরও কমিয়ে ৮ ডলার (৮৭০ টাকা) করা হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি এক সেমিনারে সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) ঊর্ধ্বতন গবেষক ও মিয়ানমারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান বলেন, ‘জাতিসংঘ রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশে যতটা তৎপর, মিয়ানমারের ভিতরে ততটা তৎপর নয়। রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।’ এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটা একটু বেশি জটিল হয়ে গেছে। অর্থায়নের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোর সাড়া কম। তবে এ সমস্যার সমাধানের জন্য আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে আগানো উচিত বলে তিনি মনে করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে। এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে কোনো বছরই প্রত্যাশিত সহায়তা পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালে পাওয়া যায় প্রত্যাশিত সহায়তার ৭৩ ভাগ, ২০১৮ সালে ৭২ ভাগ, ২০১৯ সালে ৭৫ ভাগ, ২০২০ সালে ৫৯ ভাগ, ২০২১ সালে ৭৩ ভাগ এবং ২০২২ সালে ৬৯ ভাগ সহায়তা পাওয়া গেছে। আর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য ৮৭৬ মিলিয়ন ডলার চেয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র ৪৪০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের জন্য ৮৫২.৪ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হলেও পাওয়া গেছে ৫০০ মিলিয়নের মতো। নতুন বছর ২০২৫-এ ১ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। তবে কতটুকু পাওয়া যাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয়ের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে চলতি বছর। দীর্ঘ এই সময়ে এদেশে আশ্রিত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে গত বছর প্রতিবেশী চীনের নেওয়া তৃতীয় দফার উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনীর গৃহযুদ্ধ চলায় রোহিঙ্গাসংকট আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পট পরিবর্তনের কারণেও মিয়ানমার ও চীন সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যু এড়িয়ে চলছে। ড. ইউনূসের সরকারের যুক্তরাষ্ট্রে যোগাযোগ ভালো হওয়ায় বাদ সেধেছে চীন ও ভারত। প্রতিবেশী দেশ দুটি এ বিষয়ে কোনো সহায়তাই করছে না।