রাজধানীতে বাড়ছে খোলা স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গৃহস্থালিসহ সব ধরনের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের নানা উদ্যোগের মাঝেও যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমে থাকে। রাস্তার পাশে, খালের পাশে, ফ্লাইওভারের নিচে, ময়লার ডাম্পিং স্টেশনের সামনে আবর্জনা জমে প্রতিদিনই। কোনো কোনো স্থান থেকে ময়লা পরিষ্কার করা হলেও অবশিষ্ট পড়ে থাকে আরও অনেক আবর্জনা। সেসব ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধের কারণে স্থানীয়দের মুখে রুমাল চেপে চলতে হয়।
প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস জনবহুল এই নগরীতে। প্রতিদিনই বাড়ছে নাগরিকের সংখ্যা। একই সঙ্গে বর্জ্যও। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ৭ হাজার মেট্রিকটন বর্জ্য প্রতিদিন উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ মেট্রিকটন বর্জ্য। বিশাল এই বর্জ্য সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে সিটি করপোরেশন।
যদিও বর্জ্য সংগ্রহে অর্ধেক জনবলই মাঠে থাকে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর কাকরাইলের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনের সামনের সড়ক দখল করে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। বাসা-বাড়ি ও দোকানের বর্জ্য সড়ক অর্ধেক দখলে। এসব আবর্জনার দুর্গন্ধে চলাচলকারীদের নাকে রুমাল চেপে হাঁটা দায়। একই অবস্থা পুরান ঢাকার নর্থ সাউথ রোডে। এই রোডে ফুটওভার ব্রিজের পাশে সড়ক দখল করে ফেলা হচ্ছে ময়লা। মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি স্কুলের সামনের সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই রাস্তার ওপর ফেলা হচ্ছে ময়লা। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার গৃহস্থালি ময়লা এখানে রাখা হচ্ছে। দুই ওয়ার্ডের ময়লা এখানে ফেলার কারণে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এই পথে চলাচলকারী লোকজনকে। সকালে বাসাবাড়ি থেকে ভ্যানগাড়ি করে ময়লা আনার পর এ রাস্তার ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়। সেই ময়লা ডাম্পিং স্টেশনের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে বেগম রোকেয়া সরণি যাওয়া সড়কে সংসদ সচিবালয় কোয়ার্টারের সামনের সড়কে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা যায়। এখানে বিশেষ করে বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলা হয়। এসব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ বের হয়। এই স্তূপের পাশ দিয়ে নাকমুখ চেপে হেঁটে চলা দায়। একই অবস্থা দেখা গেছে মিরপুর ১০-এর সেনপাড়া সড়কে রাস্তায় উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পড়ে থাকতে। বিশাল ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ের কারণে সড়ক সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এ সড়কটি দিয়ে একটি রিকশা চলাও দায়। বাসাবাড়ির বর্জ্য থাকায় পচে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। নাক মুখে রুমাল চেপে হেঁটে চলা কষ্টকর। মিরপুর ৬০ ফিট রুটেও সড়ক দখল করে উন্মুক্ত স্থানে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
মেয়রদের পরিকল্পনা : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও আনিসুল হক ক্লিন ঢাকা গড়তে রাস্তার পাশে মিনি ওয়েস্টবিন স্থাপনের পরিকল্পনা নেন। কিছু স্থাপন করলেও কিছুদিন পর তা উধাও হয়ে যায়। ভেস্তে যায় পরিকল্পনা। একই সঙ্গে সেকেন্ডারি ট্রান্সপার স্টেশন (এসটিএস) স্থাপনেও উদ্যোগ নেয় এই দুই মেয়র। কিছু এসটিএস নির্মাণও করেছেন। পরের মেয়াদে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও আতিকুল ইসলাম মেয়র হিসেবে ক্লিন সিটি করার ইশতেহারও দিয়েছিলেন। বাস্তবে রূপান্তর করতে পারেননি। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি ৫৪ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩২টি ওয়ার্ডে এসটিএস নির্মাণ করেছে। আর বাকি ২২টি ওয়ার্ডে বর্জ্য অপসারণ করার মতো ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৪টিতে এসটিএস নির্মাণ করেছে। বাকি ১১টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে উন্মুক্ত স্থান। সব মিলিয়ে দুই সিটির ৩৩ ওয়ার্ডে সেকেন্ডারি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। এসবের ফল হচ্ছে উন্মুক্ত কনটেইনারে রাখা হচ্ছে বর্জ্য অথবা যত্রতত্র পড়ে থাকছে ময়লা-আবর্জনা। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, আমাদের নির্ধারিত স্থানগুলো থেকে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। তবে নগরবাসী নিজের মতো করে বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলছে। নগরবাসীর অসচেতনতার কারণে যত্রতত্র ময়লা ফেলছে। তিনি আরও বলেন, নগরবাসীর সচেতনতা বাড়াতে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। এর মধ্যে শুক্রবার মসজিদে জুমার খুতবায় সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আমরা ইতোমধ্যে ৬৪টি সেকেন্ডারি ট্রান্সপার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করেছি। চেষ্টায় আছি প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি এসটিএস নির্মাণে। তাহলে যত্রতত্র ময়লা অনেকটা কমে আসবে।