সিলেট জেলাজুড়ে ছিল ছোট-বড় টিলা। সমতল ভূমিতে মাথা উঁচু করে থাকা এই টিলা ছিল সিলেটের গৌরবের। সারি সারি টিলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছিল এই জনপদের। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পড়েছে কোপ। সাবাড় করে দেওয়া হয়েছে টিলার পর টিলা। টিলাভূমিকে সমতল করে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসন। ১৫ বছরে সিলেটের অর্ধেক টিলার অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েছে প্রভাবশালীরা। পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংসের এই তান্ডবের জন্য প্রশাসনের নির্লিপ্ততাকে দায়ী করছে সচেতন মহল। অবশিষ্ট থাকা পাহাড়-টিলা রক্ষায় এখনই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি ও টিলাখেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা। সিলেট মহানগরী ছাড়াও জেলার সদর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় অনেক টিলা রয়েছে।
কিন্তু গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে সিলেটে চলছে টিলা কেটে আবাসন তৈরির মহোৎসব। নগরীর বালুচর, মেজরটিলা, আখালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা একসময় টিলাবেষ্টিত থাকলেও এখন এসব এলাকা পরিণত হয়েছে সমতলে। পরিবেশ আইনবীদ সমিতির (বেলা) করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিলেটের টিলার একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছিল। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিলেট মহানগর ও সদর উপজেলায় ১৯৯টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জে ১টি, বিয়ানীবাজারে ২৭০টি, গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি, জৈন্তাপুরে ৯৮টি টিলা রয়েছে। এ ছাড়া কানাইঘাটে ১ হাজার ৬৬০ দশমিক ৬২ একর ও ফেঞ্চুগঞ্জে ২৫১ দশমিক ০৮ একর টিলা রয়েছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় বেশ কয়েকটি টিলা থাকলেও প্রশাসনের প্রতিবেদনে সে তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বেলা জানায়, সিলেট জেলার ৬টি উপজেলা ও মহানগরীর টিলা কাটা রোধ এবং সংরক্ষণ নিয়ে আদালতে মামলা হয়। মামলাভুক্ত ওই এলাকায় ২০০৯ সালে ১০২৫টি টিলা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে টিলার সংখ্যা কমে আসে অর্ধেকে। বর্তমানে ওই উপজেলাগুলোতে কোনোরকম অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে ৫৬৫টি টিলা। অর্ধাৎ ১৫ বছরে অর্ধেকের বেশি টিলা ভূমিখেকোরা সাবাড় করে দিয়েছে। টিলা কেটে মাটি বিক্রি ও পাথর তুলতে গিয়ে ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিলেটে প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। এর মধ্যে শুধু কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা কেটে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে মারা গেছেন ৩৯ শ্রমিক। সূত্র জানায়, সিলেটের টিলাগুলো সাধারণত অব্যবহৃত ভূমি হিসেবে পড়ে আছে। টিলার মতো ভূমির মূল্য কম হওয়ায় মালিকরা টিলাগুলো কেটে আবাসন উপযোগী করে থাকেন। এ ছাড়া প্রভাবশালী টিলাখেকোরা বিভিন্ন মালিকের কাছ থেকে টিলা কিনে মাটি কেটে আবাসন প্রকল্পও গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে টিলা ধ্বংসের এই যজ্ঞ চললেও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে লোকদেখানো অভিযান ও জরিমানা করেই দায়িত্ব পালন করেন তারা। আর টিলাখেকোরা জরিমানা পরিশোধ করে পুনরায় শুরু করেন টিলা কাটা। যে কারণে সিলেটে টিলা ধ্বংস বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন সচেতন মহল। বেলা সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আক্তার জানান, সিলেটে এখনো যেসব টিলা অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। মামলাভুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ টিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড টানাতে হবে। টিলা ধ্বংসের জন্য প্রশাসনের নির্লিপ্ততাকে দায়ী করে তিনি বলেন, একসময় সিলেটে টিলা কাটার মচ্ছব চললেও প্রশাসন আইনি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। টিলা কেটে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে যেসব টিলা কাটা হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।