নিজের ১১ বছর বিদেশে থাকার কারণ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘আমরা যদি জুডিশিয়ারিকে রক্ষা করতে পারতাম, তাহলে অনেক লিডারকে দেশ ছাড়তে হতো না। অনেকের জেলে যেতে হতো না।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের একটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত, আমরা কখনো বিচার বিভাগকে পরাধীন হতে দেব না।’ নিজের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক। গতকাল বিকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে তাঁর জুনিয়ররা এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রমুখ।
নিজের বক্তব্যে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, ‘১১ বছর কেন আমি বাইরে থাকলাম। ২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো। দেশের অবস্থা বেশি খারাপ। আমাদের ঘরের বাইরে থাকতে হচ্ছে। চিন্তা করলাম মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য লন্ডন যাব। ১৮ তারিখ সকালে আমি লন্ডনে নামলাম। হঠাৎ করে দুপুরে জানতে পারলাম, আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমি নাকি ঢাকার রাস্তায় ছিলাম। পুলিশের ওপর বোম মেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘এর কিছুদিন আগে উচ্চপর্যায়ের এক দেশের কূটনৈতিক সোর্স থেকে জানতে পারলাম শেখ হাসিনা আমাকে আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) মামলায় গ্রেপ্তারের অনুমতি দিয়েছেন। কিছুই আমি জানতাম না। সুতরাং এটা আল্লাহর মেহেরবানি। পাঁচ বছর পুলিশ আমাকে অত্যন্ত জ্বালাতন করেছে। ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর পুলিশ আমার বাসায় গিয়েছে। কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত বিদেশে চলে গেলাম। ফিরতে ১১ বছর লেগেছে। ১১ বছর আমি ইংল্যান্ডে থেকে প্র্যাকটিস করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি জুডিশিয়ারিকে রক্ষা করতে পারতাম, তাহলে অনেক লিডারকে দেশ ছাড়তে হতো না। অনেকের জেলে যেতে হতো না। ১৯৩৫ সালের ব্রিটিশ সরকার থেকে গত সরকার পর্যন্ত আমরা অলমোস্ট আমাদের জুডিশিয়ারি স্বাধীন ছিল, প্রেস স্বাধীন ছিল। মানুষের স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু এই স্বাধীনতাকে গত সরকার হরণ করেছিল। আজকে বার বেঞ্চ, আপামর জনসাধারণ সবার একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত, আমরা আমাদের জুডিশিয়ারিকে কোনো সময়ই পরাধীন হতে দেব না। সাথে আমরা একটা স্বাধীন বার (আইনজীবী সমিতি) গড়ে তুলব।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ১১ বছর পরে দেশে ফিরে এসেছেন, এ জন্য আমি আনন্দিত। একই সঙ্গে আমি মনে করি, আগামীর বাংলাদেশে, বৈষম্যহীন বাংলাদেশে এক অনবদ্ধ মানুষ হিসেবে, আইনজীবী হিসেবে তিনি ভূমিকা রাখবেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আইনজীবী তাঁর মক্কেলের পক্ষে কথা বললে, আইনি সহায়তা করলে, সেই আইনজীবীকে বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করতে হয় ১১ বছর, সেটা ব্যারিস্টার রাজ্জাককে দেখলে বোঝা যায়। আমি মনে করি ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে একটি প্রতিষ্ঠান, তিনি যে ক্ষণজন্মা পুরুষ সেটা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার মনের অজান্তে প্রমাণ করে গেছে।’
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকার যখন দেখল ওনাকে আর দেশে চলতে দেওয়া যায় না, তখন ওনার পেছনে লেগে গেল। উনি দেশ ছেড়ে যান। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক (আইনের) ধারালো অস্ত্র ধরে রাখতেন বলে স্বৈরাচারী সরকার চিন্তা করে তাঁকে দেশে থাকতে দেওয়া যায় না। আল্লাহ ওনাকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছেন।’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক খুবই অসুস্থ ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে আবারও আমাদের মাঝে ফিরিয়ে এনেছেন। আমরা আশা করব তিনি আবারও আইন পেশায় ফিরে আসবেন। বিগত দিনে তিনি জ্ঞানের আলো দান করেছেন। তাঁকে আমরা আবার ফিরে পাব।’
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ১১ বছর আগে চলে যাওয়া আবার ফিরে আসা আমার কাছে অলৌকিক মনে হয়।’
তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে কেউ মনে করেনি শেখ হাসিনার মতো দুর্দান্ত প্রতাপশালী শাসক এভাবে পালিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় অর্জন আর কিছু হতে পারে না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া এই দিন তিনি মানুষকে দেখিয়েছেন।’