ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের বেশি সময়ের শাসনামলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে হয়েছে আঁতকে ওঠার মতো দুর্নীতি। প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে মেতে উঠেছিল দুর্নীতির মহাযজ্ঞে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন কিন্তু ব্যবসায়ী মহল লুটপাটের এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ছিলেন এই লুটপাটের নেতৃত্বে। সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আওয়ামী সরকারের মেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে দুর্নীতি হয়েছে এতে রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও ব্যবসা- এ তিনটি যোগসাজশ হিসেবে কাজ করেছে। এই ত্রিমুখী সিন্ডিকেট বা যোগসাজশমূলক ক্ষমতায়নের কারণেই উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী সরকারের সময় রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন থেকে নির্মাণের প্রতি ধাপে হয়েছে দুর্নীতি। এ ক্ষেত্রে কেউ নগদ কমিশন, কেউ টেন্ডার বাণিজ্য বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাইন্সেস নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। ক্যাপাসিটি চার্জের বিলের নামে গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। যার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ তৎকালীন সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিনির্ধারক এবং সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পকেটে যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। জানা যায়, গত দেড় দশকে অনুমোদন দেওয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর লাইন্সেস দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্মাণব্যয় কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বেশি ধরা হয়। আর বাড়তি এ অর্থ কমিশন আকারে ভাগ হতো বিভিন্ন স্তরে। এতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সরাসরি কমিশন নিতেন। এর বাইরে সাবেক বিদ্যুৎ সচিব, পিডিবির চেয়ারম্যান ও সদস্যরা প্রতিটি স্বাক্ষরের বিনিময়ে অর্থ নিতেন। প্রতিটি ডেস্কে ফাইল গেলেই অর্থ খরচ করতে হতো। একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত অন্তত ২০টি ধাপে এ সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হতো। এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন কোম্পানির কেনাকাটা এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া থেকে শুরু করে নানান ধরনের কেনাকাটাকাসহ লোভনীয় কমিটিতে পছন্দের কর্মকর্তাদের রাখা, পদোন্নতি ও বদলিতে এ সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের বেশি সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিজের কাছে রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. আহমদ কায়কাউস ও মো. আবুল কালাম আজাদ এবং সিনিয়র সচিব মো. হাবিবুর রহমান। এর মধ্যে কায়কাউস ও আবুল কালাম আজাদ দুজনেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ আছে যে, বিদ্যুৎ খাতের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য এমনকি প্রকল্পের কেনাকাটায় তারা নেপথ্যের ভূমিকা পালন করেন। পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানসহ সাবেক দুই চেয়ারম্যান বিদ্যুতের দুর্নীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। নসরুল হামিদের মন্ত্রিত্বের শেষ সময়ে পিডিবি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান ২৭টি সোলারভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফাইল চূড়ান্ত করেন। অভিযোগ আছে, এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকদের মধ্যে অধিকাংশই সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি। ফাইল চূড়ান্ত করার জন্য মাহবুবুর রহমান সিন্ডিডেট হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমতুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শেখ হাসিনা ছিলেন তৎকালীন সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী আর নসরুল হামিদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। গত কয়েকটি মেয়াদে তারা এ মন্ত্রণালয় হাতছাড়া করেননি। কারণ এ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রচুর টাকা বরাদ্দ হয়। আর এ টাকার ভাগ শেখ হাসিনা ও নসরুল হামিদ যেভাবেই হোক বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন।
এর সঙ্গে আরও জড়িত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা, পিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তারাও। দায়িত্বে থাকাকালেই নসরুল হামিদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের বৃহত্তম এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজে জাল-জালিয়াতি ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য মেলে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নসরুল হামিদের ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু ও সাবেক সেতুমন্ত্রীর এক ভাতিজা মিলে অন্তত চারটি কোম্পানির মাধ্যমে পাচ বছরে বাগিয়ে নিয়েছেন ৮ হাজার কোটি টাকার কাজ।