গ্যাস সংকটে ঢাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছেন। শীতে এ সংকট আরও বাড়ে। তবে গত কয়েক দিনে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দিনে ঢাকার অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাস প্রায় থাকছেই না। যেসব এলাকায় সামান্য থাকছে তা দিয়ে পানি গরম করতেও ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাতেও। ঢাকা ও আশপাশের ডায়িং, টেক্সটাইল এবং সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিট ডায়িং, ওভেন ডায়িং, স্পিনিং কারখানাগুলো ঝুঁকির মুখে আছে। ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, গ্যাস সংকটে এরই মধ্যে ৩০০-এর ওপর কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে ৫০০-এর ওপর শিল্পকারখানা। সব মিলিয়ে গ্যাস সংকটে একদিকে যেমন ঢাকার বাসাবাড়িতে চুলার আগুন জ্বলছে না অন্যদিকে ঘুরছে না শিল্পকারখানার চাকাও।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতের গ্রাহকরা দীর্ঘদিন থেকেই গ্যাস সংকটে ভুগছেন। এর মধ্যে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য মহেশখালীর ভাসমান দুটি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালের একটি কয়েক দিন বন্ধ ছিল। এতে সারা দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এর আগে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনাল থেকে ৭২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এতে দেশের কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের স্বল্প চাপ থাকবে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্থানীয়ভাবে গ্যাসের উত্তোলন কমে নেমে এসেছে ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে। সব মিলে তিতাস অধিভুক্ত এলাকায় সম্প্রতি ঘাটতি আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে সংকট মেটানোর কথা চিন্তা করলেও তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ একদিকে এলএনজি আমদানি করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, আবার এজন্য যে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে তা বেশ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) মো. সালাহ উদ্দিন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এলএনজির যে টার্মিনালটির মেরামত করা হচ্ছিল তা রক্ষণাবেক্ষণ শেষে আবার শনিবার সকাল ৮টা থেকে উৎপাদন শুরু করেছে। এজন্য ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের যে গ্যাস ঘাটতি ছিল তা ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমাদের সরবরাহের তুলনায় যে চাহিদা তা অনেক বেশি হওয়ায় গ্যাস সংকট দ্রুত কাটবে না বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের ৫০ শতাংশের ওপর ডায়িং কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে ধ্বংসের মুখে আছে। এ ছাড়া এরই মধ্যে ৩০০ শিল্পকারখানা গ্যাস সংকটের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাসের কারণে শিল্প খাতের সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য ৫০০-এর ওপর কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারের কাছে বিভিন্ন জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিশাল পরিমাণ অর্থ পাওনা। এ অবস্থায় এলএনজি আমদানি করতে বা পাওনাদারের টাকা পরিশোধ করতে প্রয়োজনীয় অর্থের ছাড় মিলছে না। ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলছে না। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) থেকে আগে প্রতিদিন গ্যাস উত্তোলন হতো ৬১১ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এ ছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শেভরন আগে যেখানে প্রতিদিন ১ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করত এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যা আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা আছে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নূরজাহান বেগম বলেন, গত দুই মাস ধরেই গ্যাস সংকটের কারণে সকাল-দুপুরে রান্নার কাজ এখন গভীর রাতে করছি। মিরপুর পল্লবী এলাকার বাসিন্দা নাছরিন জাহান বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি। কখনো রাইস কুকারে কোনোরকম খাবার বানিয়ে খাচ্ছি। দুপুরে কখনো ছাদে গিয়ে মাটির চুলায় রান্না করছি। এতে গ্যাসের লাইনের মাসিক বিলের সঙ্গে বাড়তি খরচ বেড়েছে। গৃহিণীরা আরও জানান, আগে রাতেই পরের দিনের রান্নার আয়োজন সেরে রাখতেন কিন্তু এখন রাতেও গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেকেই এজন্য সিলিন্ডার গ্যাস বা বিকল্প ব্যবস্থায় যাচ্ছেন। গ্যাস সংকটে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও বেড়েছে ভোগান্তি। চাপ কম থাকায় বেশ কয়েক ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়িচালকরা গ্যাস পাচ্ছেন না।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌ. কাজী মো. সাইদুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, আমরা এখন রেশনিং অবস্থায় আছি। আমাদের ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। এর মধ্যে এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত হয়েছে। আশা করছি রবিবার সকালের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হবে।