পথশিশু ইয়াসিন। বয়স ১০ কিংবা ১২ বছর। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেই বেড়ে ওঠা। তার পিতা-মাতা কে সে নিজেও বলতে পারে না। জিজ্ঞাসা করতেই ছলছল চোখে বলে, ‘ছোডু বেলা থাইক্যা এই লঞ্চঘাটে বড় হইতাছি। কেউ জিগায় না খাইছি কি না, কই ঘুমাইছি। আমার কেউ নাই। আমার বাপ-মা কেলা কেউ কইতে পারে না। এই এলাকায় আমি বড় হয়েছি।’ খাও কী? জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘একটা হোটেলে কাজ করতাম। একবার মালিক মেরে বেড় কইরা দিছে। মাঝে মাঝে কুলির কাজ করি। ভিক্ষা কইরা খাই। হঠাৎ হঠাৎ কেউ আপনের মতো করে জিগায় কিছু খাইতে দিলে খাই। টেকা দিলে নেই।’
ইয়াসিনের মতো এমন অসংখ্য শিশু-কিশোর শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা কখনো পেটের দায়ে দোকানে কর্মচারী, কেউ পলিথিন কুড়িয়ে বিক্রি করে। কেউ আমড়া, শসা, ফুল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার কেউ কেউ অজান্তেই মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত। এমন লাখো শিশু রাজধানী শহরে। এরা পথে ঘোরে, পথে থাকে, পথেই ঘুমায়। পথই ওদের ঠিকানা। মগবাজার চৌরাস্তায় রাকিব কাজ করে মোটর পার্টসের দোকানে। রাস্তায় ঘুরতে দেখে তাকে কাজ দেয় দোকানের মালিক। সাতরাস্তার মোড়ে ভিক্ষা করতে দেখা যায় ফয়সালকে। তার বয়স জানায় ১৩। মহাখালী বাস টার্মিনালে খুব ছোট বয়সে তাকে পান সালেহা খাতুন নামের এক মাদক কারবারি। শিশু ফয়সালকে দিয়েই মাদক আনা-নেওয়া করানো হতো। একসময় সেই মহিলাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে ভিক্ষা করেই পেট চালাচ্ছে ফয়সাল। রাজধানীর ফর্মগেট এলাকায় গিয়ে এমন আরও কয়েকজন শিশুকে দেখা যায়। কেউ কেউ বিভিন্ন বস্তিতে থাকে। কেউ আবার ভিক্ষা করে। শিশু মোবারক বলে, ‘মানুষের কাছে গিয়া বলি, খুব খিদা লাগছে, ১০টা টেহা দেন ভাত খামু। হয় ভাত খাওয়ান, নাইলে টেহা দেন। প্রতিদিন এক-দেড় শ টাকা পাই। পরে টাকা নিয়ে মায়ের হাতে দেই।’ শিশু মোবারকের বয়স মাত্র ৫। বিশ্বের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা থেকে বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকার কিছুই আসে না পথশিশু ইয়াসিনের হাতে। ইউনিসেফ বলছে, সারা দেশে এমন পথশিশুর সংখ্যা ৩৪ লক্ষাধিক। দেশের সব উপজেলায় সরাসরি জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটি বলছে, পথশিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঠিক হিসাব সরকারের কাছে না পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত পথশিশু জরিপ ২০২২ অনুযায়ী- লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনে মেয়েদের তুলনায় ছেলে পথশিশুর সংখ্যা অনেক বেশি, একজন মেয়ের বিপরীতে চারজন ছেলে শিশু। পথশিশুদের গড় বয়স ১২.৩ বছর। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মেয়েদের পাচার করে দেওয়া হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে তারা বাসাবাড়িতে কাজ করে। কারও ঠাঁই হয় পতিতাপল্লীতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের ফলাফল বলছে, প্রধানত ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশু দারিদ্র্য, ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বাবা-মা শহরে আসার কারণে এবং ১২ দশমিক ১ শতাংশ কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে শহরে এসেছে। প্রতি পথশিশুর পাঁচজনের দুজনই একা একা শহরে এসেছে। ১০ জন পথশিশুর তিনজন কখনোই স্কুলে ভর্তি হয়নি। সব পথশিশুর কেবল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণি পাস করেছে। খুব নগণ্য সংখ্যক পদ্ধশিশু নিম্ন ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেছে। প্রায় ৪ ভাগের ১ ভাগ পথশিশু ধূমপান করে এবং ১২ শতাংশ মাদকের নেশায় আসক্ত। আর ৬৪ শতাংশ পথশিশু তাদের পরিবারে ফিরে যেতে চায় না। শিশু শ্রম প্রতিরোধে গত এক যুগে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে নানা প্রকল্প নেয় সরকার। বাস্তবতা হলো- এসব প্রকল্পের একটিও তেমন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। উল্টো শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় শ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে শিশু শ্রমিক বেড়েছে সাড়ে ৮৬ হাজার। বর্তমানে দেশে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৪৭ লক্ষাধিক। জাতীয় শিশু শ্রম নিরসন নীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে, শিশু শ্রমের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক দুরবস্থা। নীতিমালায় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শ্রম থেকে প্রত্যাহার ও দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনতে মা-বাবাকে আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে নীতিমালা প্রণয়নের ১৪ বছর পরও সেটি কার্যকর করা যায়নি। শিশু অধিকার কর্মীরা বলছেন, দেশে পথশিশু এবং শিশু শ্রম প্রতি বছর বাড়ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের এ পথশিশুদের প্রতি যৌক্তিক এবং ফলপ্রসূ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।