বিচারকসংকট দেখা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছয় বিচারপতির মধ্যে একজন অবসর নেওয়ার পরই তৈরি হয় সংকট। নতুন করে বিচারক নিয়োগের আগ পর্যন্ত আপিল বিভাগে দুই বেঞ্চের পরিবর্তে একটি বেঞ্চে বিচারকার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট সূত্র। একটি বেঞ্চ কমে যাওয়ার কারণে আপিল বিভাগে মামলাজট বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
তাঁদের মতে, বর্তমানে আপিল বিভাগের ১ নম্বর বেঞ্চে মামলা নিষ্পত্তির হার খুবই কম। আবার বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে বেঞ্চ একটি কমলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে। তাই দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে আপিল বিভাগে অন্তত দুটি বেঞ্চ গঠন করা জরুরি।
এক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় দ্রুতই আপিল বিভাগে এক থেকে তিনজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে এ নিয়োগ প্রস্তাবিত বিচারপতি নিয়োগ কাউন্সিল বা কমিশন গঠনের আগে হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা।
সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকার তথ্যানুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে ছয়জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিয়মিত বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছিল দুই বেঞ্চে। ১ নম্বর বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম ২ নম্বর বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম অবসরে যাওয়ার পরই সংকট তৈরি হয়।
সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মোয়াজ্জেম হোছাইন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি রয়েছেন। তাই আপাতত একটি বেঞ্চে এ বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০১টি। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৯৮৯টি দেওয়ানি, ১০ হাজার ৭১৫টি ফৌজদারি এবং ১৯৭টি অন্যান্য। প্রত্যেক বিচারপতির সামনে মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৭৮০টির বেশি। এমন পরিস্থিতিতে মামলাজট দূর করতে আপিল বিভাগে দুটি বেঞ্চ গঠন করা জরুরি বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে দুটির বেশিও বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে। সংকটের সমাধান দ্রুতই হওয়া দরকার।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমানে আপিল বিভাগের ১ নম্বর বেঞ্চে মামলা নিষ্পত্তির হার এমনিই কিছুটা কম, সেখানে যদি কেবল এ বেঞ্চেই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাহলে নতুন করে মামলাজট বাড়তে পারে। ফলে দুর্ভোগ বাড়বে বিচারপ্রার্থীদের।’ তিনি বলেন, আপিল বিভাগে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
সংবিধানে আপিল বিভাগে বিচারপতির কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি দায়িত্বরত ছিলেন। প্রধান বিচারপতির পরামর্শ ও প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন সময়ে বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে সংবিধানের ৯৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাই কোর্ট বিভাগে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ ও নিয়োগ দেন। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘প্রধান বিচারপতি এবং প্রত্যেক বিভাগে আসন গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি যেরূপ সংখ্যক বিচারক নিয়োগের প্রয়োজনবোধ করিবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য বিচারক লইয়া সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হইবে।’ সংবিধানে ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি পদে থাকার বিধান রয়েছে।