ইফতারের সময় হালাল খাবার খাওয়ার প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। হারামের সন্দেহ থেকেও দূরে থাকা উচিত। কেননা ওই অবস্থায় রোজার কোনো অর্থ হয় না। হালাল খাবার ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত।
যদি কোনো ব্যক্তি সারা দিন হালাল খাওয়া থেকে বিরত থাকার পর হারাম খাবার দিয়ে ইফতার করে সে ওই ব্যক্তির মতো, যে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করল আর একটি শহর ধ্বংস করে দিল।
আবার হালাল খাবারও বেশি খাওয়া ক্ষতিকর। আর রোজা বেশি খাওয়ার শক্তিকে খতম করে দেয়। যে ব্যক্তি অনেক ওষুধ খাওয়ার ভয়ে বিষ খায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তাকে নির্বোধ বলা যায়।
হারামও একটি বিষ। বিষ যেমন দেহের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি হারাম জীবিকাও দ্বিনের জন্য ক্ষতিকর। আর হালাল খাওয়ার দৃষ্টান্ত একটি ওষুধের মতো। যার কম পরিমাণ খাওয়া উপকারী, আর বেশি পরিমাণ খাওয়া ক্ষতিকর।
রোজার উদ্দেশ্য—হালাল খাবারও কম খেতে হবে, তাহলে উপকার হবে।
তাড়াতাড়ি ইফতার করা : রোজায় ইফতার করার ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি করা উচিত। ইফতারে তাড়াতাড়ি করা বান্দা আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা হলো—ইফতারে বিলম্ব করা যাবে না। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ যত দিন পর্যন্ত সময় হওয়ামাত্র ইফতার করবে, তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’
(বুখারি, হাদিস : ২৮৫২)
ইফতার জলদি করার উদ্দেশ্য এটা নয়, সূর্যাস্তের আগেই রোজা ভেঙে ফেলবে বরং উদ্দেশ্য হলো, যখন সূর্য অস্তমিত হওয়া সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া, শুধুমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে ইফতারে দেরি করা উচিত নয়।
ইফতারের সময় নির্ধারণে ঘড়ি বা অন্যান্য যন্ত্রের
ব্যবহার : যে যন্ত্র উদয় ও অস্তের সঠিক সংবাদ দেয় আর সেটা পরীক্ষিতও বটে; ভালো ঘড়ির দ্বারা ইফতার ও মাগরিবের নামাজের হুকুম দেওয়া যাবে। আর বেশির ভাগ যুগে চাক্ষুষ দর্শন ও নিদর্শনাবলির মাধ্যমেও জানা যায়। (ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৬/৪৯৮)
মসজিদে সাহরি ও ইফতার করা : মসজিদে ইফতার ও সাহরি খাওয়া বৈধ। কিন্তু যতটুকু সম্ভব মসজিদকে অপরিচ্ছন্ন বানাবে না। (ফাতাওয়া রহিমিয়া : ১/৫০৮)
জাকাতের পয়সায় মসজিদে ইফতার করানো : রমজানের ইফতারি অথবা সাহরির জন্য জাকাতের অর্থ দেওয়া এভাবে জায়েজ হবে যে ইফতারি যে খাবে সে এবং সাহরি যে খাবে সে মিসকিন হয় এবং তাকে মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়। তাদের ইফতারি অথবা খাবার বণ্টন করে দেবে। সাহরি ও ইফতার গ্রহণকারী যদি ধনী-সম্পদশালী হয় তাহলে জায়েজ হবে না। (কিফায়াতুল
মুফতি : ৪/২৫৮, ফাতওয়া হিন্দিয়াহ : ২০১)
ইফতার কিসের দ্বারা হবে : খেজুর দ্বারা ইফতার করা শ্রেয়। (ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৬/৪৯৪)
তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব, অন্যথায় শুকনা খেজুর দ্বারা; যদি তা-ও না হয়, তাহলে পানি দ্বারা ইফতার করা যাবে। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৪৩৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইফতারি : আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাগরিবের আগে কিছু তাজা খেজুর দ্বারা ইফতারি করতেন। যদি তাজা খেজুর না হতো, তিনি শুষ্ক খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। আর যদি শুষ্ক খেজুরও না হতো, তবে তিন কোষ পানি পান করতেন।
ইফতারের কারণে জামাতে বিলম্ব করা : ইফতারের কারণে মাগরিবের নামাজে কিছুক্ষণ দেরি করা জায়েজ আছে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। প্রশান্তির সঙ্গে পানি পান করে বা কোনো কিছু খেয়ে ইফতার করে নামাজ আদায় করে নেবে। আর যে বিলম্ব ইফতার করার কারণে হয় সেটাকে শরিয়তপরিপন্থী মনে করবে না; বরং এটাই হলো শরিয়তসম্মত বিধান। (ফাতাওয়া দারুল উলুম : ২/৪৫, আলমগিরি : ১/৪৯)
অমুসলিমের কিছু দ্বারা ইফতার করা
প্রশ্ন : একজন হিন্দু প্রতি রমজান মাসে দুধ, চিনি ও বরফ ক্রয় করে মুসলমানদের দেয়। তার দ্বারা ইফতার করায় কোনো অসুবিধা হবে কি?
উত্তর : এর দ্বারা ইফতার করায় কোনো অসুবিধা নেই। অমুসলিমের পাঠানো জিনিস গ্রহণ করে তার দ্বারা ইফতার করা জায়েজ। (ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম : ৬/৪৯৪; কিফায়াতুল মুফতি : ৪/২৩৪)
ওষুধ দ্বারা ইফতার করা
প্রশ্ন : যে ব্যক্তি অসুস্থ সে ওষুধ দ্বারা ইফতার করতে পারবে কি না?
উত্তর : ওই ব্যক্তি ওষুধ দ্বারা ইফতার করবে, এতে কোনো অসুবিধা নেই। (ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম : ৬/৪৯৫)
মুয়াজ্জিন প্রথমে ইফতার করবেন নাকি আজান
দেবেন : সূর্যাস্তের পর মুয়াজ্জিন ইফতার করে আজান দেবেন।
ইফতার ও মাগরিবের নামাজের সময় : ইফতার ও মাগরিবের নামাজের সময় সূর্যাস্তের সঙ্গেই হয়ে যায়; দেরি করার প্রয়োজন নেই, যদিও পশ্চিম দিকে পাহাড় অবস্থিত হয়। কেননা সূর্যাস্তের অর্থ এই নয় যে দুনিয়ার কোথাও সূর্য দৃশ্যমান হবে না। এটা তো সম্ভব নয়, সূর্য কোথাও পুরোপুরি ডুবে যাবে আবার কোথাও পুরো উদিত হবে। বরং অস্তমিত হওয়া অর্থ হলো, সেটা আমাদের দিগন্ত থেকে অস্ত গিয়েছে এবং পূর্ব দিকটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে। অবশ্য যদি কোনো লোক পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সূর্য দেখতে থাকে, তবে তার জন্য ইফতারি হালাল হবে না। কেননা তার দিগন্ত থেকে সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়নি। (ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/১৭০, শামি : ২/৮০)
শহরের মধ্যে সূর্যাস্তের আলামত হলো, পূর্ব দিকে ছায়া সম্প্রসারিত হওয়া অর্থাত্ যে পর্যন্ত সুবহে সাদিক প্রকাশিত হয় সে পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আসমানের ঠিক মধ্যিখানে ছায়া পৌঁছে যাওয়া শর্ত নয়।
ইফতারের কারণে জামাত বিলম্ব করার সুযোগ আছে। (ফাতাওয়ায়ে রাহিমিয়া : ২/৩৮)
লবণ দিয়ে ইফতার শুরু করা : ‘লবণ দিয়ে ইফতার শুরু করা উত্তম’—এমন বিশ্বাস কুসংস্কার।
(আহকামে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা-২৪৭)
ইফতারের দোয়া : ইফতারের সময় এই দোয়া পড়বে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়াআলা রিজকিকা আফতারতু।’
অর্থ : আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ! আপনার সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৮)
ইফতারের পর এই দোয়া পড়বে—‘জাহাবাজ্-জামাউ, ওয়াব্ তাল্লাতিল উরুকু, ওয়া ছাবাতাল আজরু ইন্শাআল্লাহু তাআলা।’
অর্থ : পিপাসা নিবারিত হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কারও নির্ধারিত হলো।
(আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৭)
রোজা রেখে প্লেনে সফরের কারণে দিন বড় হয়ে
গেলে : পশ্চিম দিকে প্লেনে সফর করার কারণে যদি দিন বড় হয়ে যায়, তাহলে সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সূর্যাস্ত হলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইফতার বিলম্ব করতে হবে। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও সূর্যাস্ত না হলে ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার সামান্য কিছু আগে ইফতার করে নেবে।
(আহসানুল ফাতাওয়া, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৭০)
বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন