জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে চুক্তি সম্পাদন রোধ করতে সংসদের নজরদারি অত্যাবশ্যক বলে জানিয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এজন্য জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এমন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের আগে আইনসভার উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কমিশন এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেছে, সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি করার ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে স্থলসীমা চুক্তি সম্পাদন করে। কিন্তু তিন বিঘা করিডরের মাধ্যমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে বাংলাদেশি নাগরিকদের অবাধ প্রবেশাধিকারের বিষয়টি সমাধান না করায় সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। আবার ২০১৭ সালে বাংলাদেশ আদানির সঙ্গে একটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে, যা ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়। চুক্তিটির অসম বিধান সরকারকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণœ করে।
৮ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ ছয় সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে প্রধান করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর আগে কমিশন তাদের সুপারিশের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে।
সংস্কার কমিশন এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে জানায়, প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে (যেমন জার্মানি, জাপান এবং ফ্রান্স) চুক্তি অনুমোদনের জন্য আইনসভার উভয় কক্ষের সম্মতির প্রয়োজন। এই পদ্ধতি জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষায় আইনসভার নজরদারি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সে শান্তি, বাণিজ্য বা ভূখন্ড সম্পর্কিত চুক্তির জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। যুক্তরাজ্যেও আন্তর্জাতিক চুক্তির ওপর সংসদীয় নজরদারির বিধান রয়েছে। ২০১০ সালের সংবিধান সংস্কার ও প্রশাসন আইন অনুসারে, এরূপ চুক্তি সংসদে ২১ দিনের জন্য উপস্থাপন করা হয় এবং এ সময়ের মধ্যে যে কোনো কক্ষ আপত্তি উত্থাপন করতে পারে। কমিশন মনে করে, উভয় কক্ষের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ফলে যে কোনো চুক্তির ব্যাপক পরীক্ষণ সম্ভব, যা ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করবে। চুক্তি সম্পর্কে গভীর আলোচনা ও বিবেচনার সুযোগও এই প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হয়। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে সংসদে চুক্তি অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানিয়েছে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৫ ক এর মাধ্যমে কেবলমাত্র বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সংসদে উপস্থাপনের বিধান করা হয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করার বিধান আছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি, চুক্তিপত্র এবং দলিলসমূহ গোপনীয়তার আড়ালে সম্পাদন সম্ভব। কমিশন সুপারিশ করছে যে, সব ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি/চুক্তিপত্র/দলিল যা কোনো দেশ/সংস্থা/করপোরেশনের সঙ্গে সম্পাদিত হয়, তা সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। ‘বিদেশি রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তি, এবং বিদেশি সংস্থা ও বিদেশি বা বিদেশি মালিকানাধীন করপোরেশনের সঙ্গে সব চুক্তি ও চুক্তিপত্র নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পাদিত হবে এবং নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক সংসদে উপস্থাপিত হবে। আইনসভার উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় গোপনীয়তা রক্ষা করে আলোচিত হবে। তবে, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত অংশীদারি, সীমানা, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত যে কোনো চুক্তি, চুক্তিপত্র বা দলিল সংসদের উভয় কক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদনের পরেই সম্পাদন করা যাবে।’