রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার শীর্ষে এখন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল গঠনে বিষয়টি। কারা আসবেন নেতৃত্বে, কী হবে দলের নাম-প্রতীক, সর্বোপরি কবে আসবে নতুন এই দল- এসব প্রশ্নই আসছে ঘুরেফিরে। শীর্ষ পদগুলো নিয়ে দ্বন্দ্ব সামাল দিয়ে উঠলেও স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি। তরুণ রাজনীতিবিদদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রিক একচেটিয়া নেতৃত্ব নিয়ে দানা
বেঁধে উঠছে ‘চাপা অসন্তোষ’। এদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ নিয়েও রয়েছে প্রস্তুতির ঘাটতি। জাতীয় নাগরিক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, আবারও পেছাতে পারে আত্মপ্রকাশের দিন। নাগরিক কমিটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাবি ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে অনেক নেতা উঠে এসেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত শীর্ষ নেতৃত্বের সব কয়টি পদে ঢাবি কোরামের একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ না খুললেও ভিতরে ভিতরে চাপা অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
অসন্তোষ জানিয়ে এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঢাবির একাধিপত্যের বিষয়টি দীর্ঘ দিনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, এবার অন্তত সেটির ব্যতিক্রম ঘটবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি ঢাবির বাইরে থেকে এসে যারা রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের মধ্যে যোগ্যতার অভাব রয়েছে?’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে দেশের অন্যান্য জেলা, ক্যাম্পাস এমনকি ঢাকার ভিতর যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়েছে তাদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে অনীহা তৈরি হবে। ঢাবির এ বিষয়টি সবার মানসিকতায় এমনভাবে প্রভাব ফেলেছে যে, প্রজার ছেলের যত যোগ্যতাই থাকুক না কেন শুধু রাজার ছেলেই রাজা হবে।’ বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের মধ্যেও। রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ রাজনীতিবিদ বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারই প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল। ফ্যাসিস্ট সরকারের চাপে যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল, তখন তারাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তাদেরকে আর কোথাও দেখা যায়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ- শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারাই রাজনীতি করে এসেছে এবং তারাই করবে এই মনোভাব আমাদের মানসিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আল মাহমুদ বলেন, নতুন দলে সাবেক ‘ছাত্রশক্তি’ করা ঢাবির ভাই-ব্রাদারদের মধ্যে সিন্ডিকেট করা ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটা অভিযোগ চাউর হচ্ছে। এই প্রবণতা বহাল থাকলে অন্যরা এখানে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করবেন। বড় দলে পরিণত হতে চাইলে স্বাধীন ও উদারভাবে যে কোনো জায়গা থেকে নেতৃত্ব বিকশিত হতে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দলের সাংগঠনিক কাঠামো সুসংহত হওয়ার আগে নেতাদের নিজেদের মধ্যেও নেতৃত্ব নিয়ে রেষারেষি না থাকাটা ভালো। জাতীয়ভাবে অন্তত ১০-১৫ জন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব তৈরি হওয়া উচিত যারা সততা, বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বের যোগ্যতায় দলের কান্ডারি হিসেবে বিবেচিত হবেন।
পেছাতে পারে আত্মপ্রকাশের দিন : আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি দল আত্মপ্রকাশের গুঞ্জন শোনা গেলেও এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি তরুণদের পক্ষ থেকে। প্রস্তুতির ঘাটতি থাকায় আত্মপ্রকাশ আরও এক-দুই দিন পেছাতে পারে বলে গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। তবে কোনোভাবেই ২৮ ফেব্রুয়ারির বাইরে যেতে চান না বলেও জানান তারা।