ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ইস্যু ঘিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনার জেরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) একাডেমিক কার্যক্রম ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্যাম্পাসে সবধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মঙ্গলবারের ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনসহ পাঁচটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল অনলাইনে সিন্ডিকেটের ৯৮তম বিশেষ জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিকে, আগের দিন ঘোষিত পাঁচ দফা দাবি আদায়ে গতকাল সকাল থেকেই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সামনে অবস্থান নেয়। পরে দুপুর দেড়টার দিকে তারা পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনের প্রবেশপথে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এতে উপাচার্যসহ অন্যরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এর আগে সকালে দাবি আদায়ে আলটিমেটাম দিয়ে ক্লাস বর্জন করে শিক্ষার্থীরা। সব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, কুয়েটে সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্র হাতে ভাইরাল খুলনার দৌলতপুর থানা যুবদলের সহসভাপতি মাহবুবুর রহমানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল কেন্দ্রীয় যুবদলের দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গতকাল অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কুয়েটে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ঘোষিত রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের আদেশটি বহাল থাকবে অর্থাৎ ওই আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল, তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৩ এর ধারা ৪৪(৫) অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী চাকরিচ্যুতসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া রাজনীতির সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তদন্তসাপেক্ষে আজীবন বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে।
মঙ্গলবারের ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. এম এম এ হাসেমকে সভাপতি করে গঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবিতে অনড় রয়েছেন। উল্লেখ্য, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ঘিরে ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হয় অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থী। কুয়েটে ছাত্রদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়।
কুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাঁচ দাবি হচ্ছে- ১. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবে না, ২. হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কুয়েট প্রশাসন থেকে হত্যার চেষ্টা ও নাশকতার মামলা করতে হবে, ৩. শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, ৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হবে এবং ৫. ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগ করতে হবে।
ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলন : কুয়েট পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মো. ইয়াহিয়া দাবি করেন, শুরু থেকেই ছাত্রদল ইতিবাচক রাজনীতি করে আসছে। ছাত্রলীগের মতো একটি দলই রাজনীতি করবে আর বাকিদের যদি রাজনীতি করতে না দেন, তাহলে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা হবে। ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম বলেন, ‘কুয়েটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন। তারা রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা নিজেদের কার্যক্রম চালু রেখে কোন মুখে দাবি করে এখানে ছাত্র রাজনীতি চালু করতে দেবে না।’
এদিকে কুয়েট উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রায় ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গতকাল বিকাল ৫টার দিকে সেখান থেকে মুক্ত হন। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে বর্জনের ঘোষণা দিয়ে স্লোগান দেন। কুয়েটের জনসংযোগ বিভাগের পাবলিক রিলেশনস অফিসার শাহেদুজ্জামান শেখ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উ™ূ¢ত পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়তে শুরু করেছেন। ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে যারা ভাড়া রয়েছেন তাদের ভিতর আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে খানজাহান আলী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন জানান, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক হওয়া পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।