এবারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের নানা বিষয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসিরা। এসব প্রস্তাবের সূত্র ধরে উপদেষ্টাসহ মন্ত্রণালয়ের সচিবরা দিকনির্দেশনা দেন মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। জুলাই আন্দোলনে শহীদ ছাত্র-জনতার স্মৃতি রক্ষার প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসিরা। এদিকে আন্দোলনে নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’র পরিচিতি দেওয়া হবে। শহীদের পরিবার পাবে ৩০ লাখ টাকা, ‘যোদ্ধারা’ পাবেন মাসিক ভাতা। একই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়ে যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ডিসি সম্মেলনের কার্য অধিবেশন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকার পতন আন্দোলনের পর এবারের ডিসি সম্মেলনে ঘুরে ফিরে ছাত্র-জনতার বীরত্বগাথা এসেছে নানাভাবে। নতুন বাংলাদেশ গঠনে মাঠ প্রশাসনে ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সম্মেলনের উদ্বোধনও হয়েছে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে। তিন দিনের ডিসি সম্মেলন আজ শেষ হচ্ছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদ ছাত্র-জনতার স্মৃতি রক্ষায় সব জেলায় উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন কক্সবাজারের ডিসি। তিনি বলেন, বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ার ক্ষেত্রে শহীদ ছাত্র-জনতার স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখা দরকার। সব জেলায় এ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব রেখেছেন তিনি। এদিকে গতকাল দ্বিতীয় দিনের কার্য অধিবেশনে ডিসিদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ অধিবেশন শেষে তিনি বলেন, জুলাই অধিদপ্তর গঠনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। এ সপ্তাহে অধিদপ্তর গঠন হবে। অধিদপ্তর করার নিরিখে একটি নীতিমালাও হয়েছে। গণ অভ্যুত্থানে নিহতরা ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে পরিচিতি পাবেন। সনদপত্র পাবেন, পরিচয়পত্র পাবে তাদের পরিবারগুলো। অন্যান্য সরকারি সুবিধাও পাবেন। উপদেষ্টা বলেন, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা পাবে। চলতি অর্থবছরে তাদের ১০ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে, আগামী অর্থবছরে তারা ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাবে। আহতরা তিনটি ক্যাটাগরিতে সহায়তা পাবেন উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আহতরা আজীবন চিকিৎসাসুবিধা পাবেন এবং তাঁরা ভাতাও পাবেন। যাঁরা গুরুতর আহত তাঁরা এককালীন ৫ লাখ টাকা পাবেন এবং প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন। একটি অঙ্গহানি হয়েছে এমন আহতরা প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাতা পাবেন এবং তারা এককালীন ৩ লাখ টাকা পাবেন। সামান্য আহত ছিলেন চিকিৎসা নিয়েছেন ভালো হয়ে গেছেন, তাঁরা চাকরিসহ পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার পাবেন। তাঁরা কোনো ভাতা পাবেন না। এ ছাড়া আহতরা বিভিন্ন মাত্রায় প্রশিক্ষণ পাবেন। সরকারি, আধাসরকারি ও অন্যান্য চাকরিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের কর্মসংস্থান করা হবে। তাঁরা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পাবেন। আন্দোলনে আহত-নিহতের তালিকা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা রয়েছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারুক-ই আজম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ তাঁদের তালিকা আমরা পেয়েছি ১৬ জানুয়ারি রাতে। ওই সময় রাত ৩টায় গেজেট প্রকাশ করে দিয়েছি। তালিকাটাও তৈরি হচ্ছে খুব দ্রুত। মেডিকেল সেল থেকেই এটা করা হচ্ছে। সেটা যখন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে আসবে, আমরা তাৎক্ষণিক তা গেজেটে প্রকাশ করে দেব। সুতরাং এখানে কারও ঢোকা কিংবা এটা থেকে কারও বের হওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, ডিসিরা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। ভুয়াদের ব্যাপারে জেলায় জেলায় মুক্তিযোদ্ধারা খুবই সোচ্চার। এদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য ডিসিরা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চেয়েছেন। ডিসিদের বলা হয়েছে, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) পুনর্গঠন করা হয়েছে। জামুকার যে আইন ছিল সেটাতে সংশোধন আনা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞার নিরিখে এ সংশোধন আসছে। সংশোধন আসার পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদও পুনর্গঠিত হবে। পরে প্রতিটি জেলায় যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে আমরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করব। যাদের আমরা শনাক্ত করতে পারব, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসব।