সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য গড়তে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, অন্যতম প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ দুই ডজনের বেশি রাজনৈতিক দল ও জোটের শতাধিক নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক বেলা ৩টায় শুরু হয়ে চলে প্রায় চার ঘণ্টা। বৈঠকে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা নির্বাচন, সংস্কার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন।
দ্রুত জাতীয় নির্বাচন চাই : ন্যূনতম সংস্কার শেষে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা আশা করব, এই সংস্কারের বিষয়ে ন্যূনতম যে ঐকমত্য তৈরি হবে, তার ওপর ভিত্তি করে অতি দ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন আগে হতে হবে। তার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন। মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম বৈঠক করলেন। এ বৈঠকে তিনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কথা বলেছেন। দলগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, সংস্কারের যে প্রতিবেদনগুলো বিভিন্ন কমিশন জমা দিয়েছে, সেগুলোর ওপর আলাপ-আলোচনা হবে। দলগুলো এনিয়ে কমিশনগুলোর সঙ্গে কথা বলবে। একটা ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।
সংস্কারের সব পজিটিভ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাব : সব পজিটিভ (ইতিবাচক) সিদ্ধান্তকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থন জানাবে জানিয়ে দলটির নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, আমরা বলেছি, এই সংস্কার কমিশন তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিতে হবে। ডা. তাহের বলেন, বৈঠকে বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি। তারা আমাদের সংস্কারের রিপোর্ট বই দেবেন। সেই বই পর্যালোচনা করে জামায়াতে ইসলামী এবং সরকারের যে টিম রয়েছে তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক হবে। সেখানে আলোচনা করে মূল সিদ্ধান্ত জানাব। তিনি বলেন, আমরা বলেছি, যে সংস্কারটা প্রয়োজন তাতে আমরা ঐকমত্য এবং যথাসময়ে নির্বাচন দিতে হবে।
সংস্কার করতে হবে ঐকমত্যের মাধ্যমে : নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে তার বহুত্ববাদ। তবে আমাদের সংস্কারটা করতে হবে ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, যতগুলো প্রস্তাব আসবে, সেগুলো আপনাদের দেওয়া হবে। আপনারা পড়ে সে বিষয়ে মতামত দেবেন এবং সেগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এরপর জনগণই বিচার করবে, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। এমন পরিস্থিতি যদি আসে যে, কোনো একটা মত সঠিক মনে হচ্ছে না, সেটাও যুক্তিযুক্তভাবে বদলানো হবে, আর এভাবেই তৈরি হবে জাতীয় ঐকমত্য।
সংস্কারের জন্য ছয় মাসের কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা : সব রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে প্রস্তাবনা আসার পর প্রধান উপদেষ্টা আগামী ছয় মাসের একটি টাইম ফ্রেম নির্ধারণ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা আশা করেছেন আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার করা যাবে। এটি নিয়ে মূল আলোচনা হয়েছে। মামুনুল হক বলেন, আমরা বলেছি, বাংলাদেশে যে সংস্কারের আলোচনা চলছে সেগুলো কিছু ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে হওয়া উচিত। জুলাই বিপ্লবের যে ঘোষণাপত্র সেটি অতি দ্রুত তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছি। ’৪৭, ’৭১, ’২৪ ভিত্তি ধরে আগামী দিনের প্রস্তাবনা আমাদের দলের পক্ষ থেকে দিয়েছি।
গণহত্যা, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, ‘বৈঠকে সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে গণহত্যার বিচার, দুই. আলাপ-আলোচনা করে সংস্কার সম্পন্ন করা এবং তিন. এই বছরের মধ্যে জাতীয় ত্রয়োদশ নির্বাচন সম্পন্ন করা।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে : জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন চাই না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিষিদ্ধ করতে হবে। ববি হাজ্জাজ বলেন, গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ দেশে গণহত্যা চালিয়েছে। তারা গত সবকটি নির্বাচনে ভোট ডাকাতি করেছে। জুলাই-আগস্টে নজিরবিহীন গণহত্যা চালিয়েছে। তাই দলটি এখন দেশের মানুষের কাছে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি, যেন সরকারিভাবে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল ঘোষণা করা হয়, সেই সঙ্গে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
প্রশাসনে সরকারের কর্তৃত্ব এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি : আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেছেন, প্রশাসনে সরকারের কর্তৃত্ব এখনো সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো নির্বাচনের আয়োজন করলে সেটা হবে বিপজ্জনক। আমরা বলেছি, একটি ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে কীভাবে নির্বাচন করবেন। স্থানীয় নির্বাচন আগে করেন বা জাতীয় নির্বাচন আগে করেন; কিন্তু আপনার প্রশাসনিক কর্তৃত্ব লাগবে।
স্থানীয় নির্বাচন আগে হলে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবে : জাতীয় নির্বাচনের আগে যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয় তাহলে মানুষের অগ্রাধিকার বদলে যাবে, তাতে অনেক নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া। তিনি বলেন, যারা এ অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন- সবার কথা হলো, জনগণ যেন অভ্যুত্থানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকে। অভ্যুত্থানের শক্তি যেন ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী দিনের কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনে অগ্রসর হতে পারি সেটাই একান্ত কাম্য। এ ছাড় বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব ইউনুছ আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানিসহ তিনজন, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম ছাড়াও হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয় গণফ্রন্ট, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণফোরাম, আমজনতার দলের নেতারা অংশ নেন।