অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গণ অভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ সার্থক করতে এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাই মিলে সব রকম চেষ্টা করব। আমরা একটা বৈষম্যমুক্ত সুন্দর সমাজ, সুন্দর রাষ্ট্র গঠন করতে চাই। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাস ছিল প্রথম ইনিংস, প্রস্তুতি পর্ব। সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরুর মাধ্যমে দ্বিতীয় ইনিংসের যাত্রা হলো। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও আমরা যদি নতুন বাংলাদেশ গড়তে না পারি, এটা আমাদের কপালের দোষ। আমরা এ সুযোগ হারাতে চাই না। গতকাল বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠকের প্রারম্ভিক বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, প্রতিজ্ঞা করি আমরা যেন গণ অভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মান না জানাই। তাদের আত্মত্যাগকে সার্থক করার জন্য আমরা সবাই মিলে সব রকম চেষ্টা করব, যেন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। প্রথম অধ্যায় শেষ। আজকের এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করলাম। আমরা যেন এমন একটা দেশ গড়তে পারি যেটা সুশৃঙ্খলভাবে চলবে। যে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার সুযোগ পেয়েছিল, সেই কাঠামো থেকে যেন আমরা বেরিয়ে আসতে পারি। দেশটাকে তামাশায় পরিণত করে ফেলা হয়েছে। আইন বলে কিছু নেই। তিনি বলেন, প্রথম পর্বের পর আমরা দ্বিতীয় পর্ব শুরু করলাম। দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তিতেও যেন আমরা গর্ববোধ করতে পারি, আমাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সুন্দরভাবে খুশিমুখে আমরা তা সমাপ্ত করতে পেরেছি। নতুন বাংলাদেশে যে নতুন নির্বাচন হবে সেটা নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে। যে আইনকানুন হবে, সেটা নড়চড় করার সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহল বর্তমান সরকারকে শুধু সমর্থন নয়, সমর্থনকে কাজে লাগানোর জন্য সর্বাত্মক সহায়তা করছে। আমরা ব্যর্থ হতে চাই না। সমাজে নানাজনের নানা মত থাকবেই। সংস্কার কমিশন দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশমালা তৈরি করেছে। তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নে সবাই মিলে মতামত ও দিকনির্দেশনা দেবেন। প্রয়োজনে আপনারা নিজেরা আলোচনা করুন। এটা কারও একার বাংলাদেশ না, সবার বাংলাদেশ। সবাই মিলে নীতিমালা ও আইনকানুন একবার করে দিলে তা বছরের পর বছর চলতে থাকবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ছাত্র-জনতা আত্মত্যাগ করে গেছে নতুন বাংলাদেশের জন্য। সেই নতুন বাংলাদেশ তৈরি করতে সংস্কার করতে হবে। সংস্কার কমিশনগুলো সুপারিশ দিয়েছে। আপনারা যেহেতু জনগণের নেতা, রাজনৈতিক দলের নেতা, এ আইনগুলো আপনাদেরই প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হবে, আপনারা মত দেবেন। এজন্য আপনাদের সময় দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে এমন মজবুতভাবে আইনকানুনগুলো বানাব যা সবাই মেনে চলবে। সেই মেনে চলার মাধ্যমেই একটা সুন্দর সমাজ, সুন্দর রাষ্ট্র গঠন করতে পারব। আমাদের ঐকমত্য হলে সুযোগটা কাজে লাগাতে পারব। বংশপরম্পরায় এর সুফল ভোগ করতে পারবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দেব না। আপনাদের সহযোগিতা চাই এটাও বলব না, কারণ এটা আপনাদেরই কাজ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গত ছয় মাসে রাজনৈতিক দলের নেতাসহ সাধারণ মানুষের সমর্থন ছাড়াও পৃথিবীজুড়ে আমাদের প্রতি সমর্থন গড়ে উঠেছে। যে কারণে অপর পক্ষ সুবিধা করতে পারছে না। বহু গল্প ফাঁদছে, গল্প টেকাতে পারছে না। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন ক্রমাগত বাড়ছে। তারা সব ধরনের সহায়তা করতে চায়। জাতিসংঘও সমর্থন দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের একটি প্রতিবেদন সব বদলে দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে পুরো পৃথিবী জানতে পেরেছে বাংলাদেশে কেমন হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল, কার হুকুমে হয়েছিল। অক্ষরে অক্ষরে বলে দিয়েছে কোথায় কোথায় কাকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশকে ঘিরে যে অপপ্রচার চলছিল, এই এক প্রতিবেদন সব ভ-ুল করে দিয়েছে।