আয়নাঘর পরিদর্শন শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দেশে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া (অন্ধকার যুগ)’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। গুম খুনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের বিচার করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘তা (বিচার) না হলে, এটা থেকে আমরা নিষ্কৃতি পাব না। যারা নৃশংস কাজ করেছে তাদের জন্য আমরা কেন ভুক্তভোগী হতে যাব।’ গতকাল রাজধানীর তিনটি গোপন বন্দিশালা (আয়নাঘর) পরিদর্শন শেষে এ কথা বলেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, ‘আমরা শুনি, আইয়ামে জাহেলিয়া’ বলে একটা কথা আছে! গত সরকার ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ প্রতিষ্ঠা করে গেছে সর্বক্ষেত্রে। এটা (আয়নাঘর) তার একটি নমুনা।’ বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম বা আটক রাখার জন্য যে গোপন বন্দিশালা ব্যবহার করা হতো সেগুলো আয়নাঘর নামে পরিচিতি পেয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, প্রধান উপদেষ্টা রাজধানীর আগারগাঁও, কচুক্ষেত ও উত্তরা এই তিনটি স্থানে আয়নাঘর পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এ ছাড়াও আয়নাঘরে আটক থাকা ভুক্তভোগী, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), আলজাজিরা ও নেত্র নিউজ এই তিনটি গণমাধ্যমের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আয়নাঘর দেখে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বীভৎস দৃশ্য! মনুষ্যত্ব বোধ বলে কিছু নেই!’
‘এখানে যা হয়েছে, সবই ছিল নৃশংস! যা শুনি, অবিশ্বাস্য মনে হয়! এটা কি আমাদেরই জগৎ! আমাদের সমাজ! আমরা এটা করলাম!’
তিনি বলেন, ‘যাঁরা নিগৃহীত হয়েছেন, যারা এটার শিকার হয়েছেন, তাঁরাও আমাদের সঙ্গেই আছেন, তাদের মুখ থেকে শুনলাম। কী হয়েছে, কোনো ব্যাখ্যা নেই।’ ড. ইউনূস বলেন, ‘এখানে যাদের নিয়ে আসা হয়েছে, বিনা দোষে কতগুলো সাক্ষীসাবুদ জোগার করে- এক্সক্লুসিভ গাড়ির ভিতর ঢুকিয়ে তাদের বলা হয়েছে, তুমি সন্ত্রাসী, জঙ্গি। এগুলো বলে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে।’ সারা দেশে ৭০০ থেকে ৮০০ আয়নাঘর রয়েছে এমন ধারণা দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এ রকম টর্চার সেল সারা বাংলাদেশে আছে। ধারণা ছিল, এখানে কয়েকটা আছে। এখন শুনছি বিভিন্ন ভার্সনে দেশজুড়ে আছে। এদের সংখ্যাও নিরূপণ করা যায়নি।’
গুম কমিশনকে এসব আয়নাঘর নিয়ে তদন্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের যে চূড়ান্ত রূপ দেখলাম, এটা তার একটা প্রতিচ্ছবি।’ গুম কমিশনের প্রতিবেদন সবার পাঠ্য হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভুক্তভোগীদের সংখ্যা সতেরো শ-এর বেশি উল্লেখ করে ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘আমাদের জানার বাইরে অজানা আরও থাকতে পারে। কেউ কেউ বলেন, এটা তিন হাজারের বেশি। এই যে উধাও হয়ে গেছে, মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কেউ বলতে পারছে না।’
ভুক্তভোগী একটি মেয়ের বক্তব্য তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সে বলতেও পারছে না তার মা কোথায়? আজকে ৯ বছর হয়েছে। যখন তার মাকে ধরে আনা হয়েছিল, তখন তার বয়স ছিল এগারো বছর। একজন বলছিলেন, খুপরির মধ্যে তাকে রাখা হয়েছে। এর থেকে তো মুরগির খাঁচাও বড় হয়। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এভাবে রাখা হয়েছে!’
এটিকে আয়নাঘরের সামান্যতম দৃশ্য উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এর কঠিনতম শিক্ষা হলো যারা করেছে তারা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই, আমাদেরই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আমরা এই সমাজকে যদি এর থেকে বের করে না আনতে পারি- তাহলে এ সমাজ টিকে থাকবে না।’
জনগণের কাছে এই গুম-খুনের বিচারের আবেদন জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা আমাদের সবারই অপরাধ। মানুষের কাছে এখন বিচার রইল, কীভাবে আমরা এ সমাজ থেকে বের হয়ে একটা নতুন সমাজ গড়তে পারি। আজকে আমরা মুক্ত হলাম, এই মুক্ত বাংলাদেশে এটা (মানবাধিকার লঙ্ঘন) থেকে যেন অতি দূরে আমরা চলে যেতে পারি।’
বিচারের কাজে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য আয়নাঘরের সব তথ্যপ্রমাণ সিলগালা করে রাখার কথাও জানান প্রধান উপদেষ্টা।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ন্যায় বিচারটা যেন দ্রুত হয়, আমরা সেটা দেখছি। মামলার দীর্ঘসূত্রতা থেকে যেন রক্ষা পায়, এটা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার, তারপর দেখা যাবে তাদের জন্য কী করা যায়! যে জীবন গেছে, সেটা তো ফিরিয়ে দিতে পারব না।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন বাংলাদেশ ও নতুন পরিবেশ গড়তে চাই। সরকার সে লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন করেছে। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করবে।’