ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিটি। সংসদ থাকা ও না থাকা অবস্থায়ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবে এই কাউন্সিল। এটা রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। সংবিধানে থাকা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তের জন্যে এনসিসি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এটা হবে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
সংবিধান সংস্কার কমিশন জানিয়েছে, অধিকাংশ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এনসিসি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের তথা রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর একক নিরঙ্কুশ আধিপত্য থেকে মুক্ত করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার আওতায় এনে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে। ৮ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ ৬ সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে প্রধান করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর আগে কমিশন তাদের সুপারিশের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে। সুপারিশ অনুযায়ী, সংসদ বহাল থাকলে কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে থাকবেন- রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, নিম্নকক্ষের স্পিকার, উচ্চকক্ষের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিরোধী দল মনোনীত নিম্নকক্ষের ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দল মনোনীত উচ্চকক্ষের ডেপুটি স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিনিধিত্বকারী সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের উভয় কক্ষের সদস্যরা ব্যতীত, আইনসভার উভয় কক্ষের বাকি সব সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাদের মধ্য থেকে মনোনীত একজন।
অন্যদিকে সংসদ না থাকলে কাউন্সিলের সদস্য থাকবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, বিচারপতি ও প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত উপদেষ্টা পরিষদের দুজন সদস্য। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে- এনসিসি সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য কার্যাবলি সম্পাদন করবে। আইনসভা আইন দ্বারা এনসিসিকে অতিরিক্ত কার্যভার অর্পণ করতে পারবে। এ ছাড়া এনসিসি-নির্বাচন কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার, অ্যাটর্নি জেনারেল, সরকারি কর্ম কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার, মানবাধিকার কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার, প্রধান স্থানীয় সরকার কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার, প্রতিরক্ষা-বাহিনীসমূহের প্রধান, আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম পাঠাবে। পাশাপাশি এনসিসি নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নাম পাঠাবে। এনসিসি নিজস্ব কর্মপদ্ধতি এবং অন্যান্য উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রয়োজনীয় রুলস তৈরি করবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে- এনসিসি প্রতি তিন মাসে অন্তত একটি সভা আয়োজন করবে। তবে রাষ্ট্রপতি যে কোনো সময়ে বিশেষ সভা আহ্বান করতে পারবেন। বিশেষ প্রয়োজনে এনসিসির তিন সদস্যের লিখিত অনুরোধে রাষ্ট্রপতি জরুরি সভা আহ্বানে বাধ্য থাকবেন। রাষ্ট্রপতি নিয়মিতভাবে এবং তার অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি, এনসিসির সভায় সভাপতিত্ব করবেন। এনসিসি গঠনের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে সংবিধান সংস্কার কমিশন জানিয়েছে, সংবিধানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অতীতে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা সম্ভব হয়নি। দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় অতীব জরুরি। এর মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত চাহিদার বাস্তবিক রূপায়ণ সম্ভব। এই মর্মে, কমিশন রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে একটি সমন্বিত সংস্থা, যা জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল নামে পরিচিত হবে।
কমিশন জানিয়েছে, এনসিসি হবে রাষ্ট্রের মধ্যে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি সাংবিধানিক কলেজিয়াল বা যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবে এবং শাসনব্যবস্থায় পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্রের অঙ্গসমূহ ও সরকারের বিভিন্ন শাখাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এনসিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এনসিসি রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে সাংবিধানিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও সমুন্নত রাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে।
ফ্রান্স, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, ঘানা, কম্বোডিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং কাজাখস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশের সংবিধান আদলে সাংবিধানিক কাউন্সিলের ধারণা গ্রহণ করেছে।