দুর্নীতি সূচকে দুই ধাপ নিচে নেমেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪তম। এটি খুবই বিব্রতকর বলে জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। স্কোর হিসাবে গত ১৩ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই স্কোর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শেষের দুই মাস ছাড়া পুরো সময়টা ছিল স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলের তথ্য-উপাত্ত। দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্কোর ২৩। একই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অবস্থান করছে কঙ্গো ও ইরান। তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৫১তম। ২০২৩ সালে ১৪৯তম অবস্থানে ছিল।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে গতকাল বেলা ১১টায় মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কার্যালয়ে দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই)-২০২৪ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. মো ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় সারা বিশ্বে একযোগে দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করা হয়।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তান ১৭ পয়েন্ট নিয়ে সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে রয়েছে। এর পরই বাংলাদেশের স্কোর এবং অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের নিম্ন স্কোর প্রমাণ করে- বিগত ১৩ বছর কর্তৃত্ববাদী সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে। দুর্নীতি সংঘটনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেছে। দুর্নীতিবিরোধী বাগাড়ম্বর ছাড়া এ নিয়ে পতিত আওয়ামী সরকারের কোনো চিন্তা দেখা যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও তাদের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থ পাচার এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকেও চারবার জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের স্কোর কর্তৃত্ববাদী অন্য দেশগুলোর তুলনায়ও কম। হাসিনার আমলে বেশি দুর্নীতি হয়েছে সরকারি প্রকল্পের কেনাকাটায়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয় ভুটানে। ১০০-এর মধ্যে ৭২ স্কোর নিয়ে তাদের অবস্থান ১৮তম। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে স্কোর বিবেচনায় বাংলাদেশের নিম্নমুখী যাত্রা সুস্পষ্ট। ২০১২ থেকে সূচকে ব্যবহৃত ১০০ স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৫ থেকে ২৮-এর মধ্যে আবর্তিত ছিল। ২০২৩ সালে এক পয়েন্ট অবনমন হয়ে ২৪ এবং ২০২৪ সালে আরও এক পয়েন্ট অবনমন হয়ে ২৩ হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২৪ মেয়াদে সিপিআই স্কোরের প্রবণতা বিশ্লেষণ অনুযায়ী টানা চার বছরসহ মোট ছয়বার বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৬, তিনবার ২৫ এবং একবার করে ২৪, ২৭ ও ২৮। নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সর্বোচ্চ চারবার ১৩তম, তিনবার ১৪তম, দুবার ১২তম এবং একবার করে ১৫, ১৬ ও ১৭তম। ১৯৯৫ সাল থেকে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দ্বারা প্রতি বছর এই সূচক প্রকাশ করা হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রথম তালিকাভুক্ত হয়। তখন এ তালিকায় মোট ৯১টি দেশ ঠাঁই পায়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
সবচেয়ে কম দুর্নীতি ৫ দেশে : সিপিআই অনুযায়ী, ১০০-এর মধ্যে ৯০ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ডেনমার্ক। ১৯০টি দেশের মধ্যে ডেনমার্কে সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয়। তার পর সবচেয়ে কম দুর্নীতি থাকা দেশগুলোর মধ্যে ৮৮ স্কোর নিয়ে ফিনল্যান্ড দ্বিতীয়, ৮৪ স্কোর নিয়ে সিঙ্গাপুর তৃতীয়, ৮৩ স্কোর নিয়ে নিউজিল্যান্ড চতুর্থ এবং ৮১ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে লুক্সেমবার্গ, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি যেসব দেশে : ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির মাত্রা ছিল দক্ষিণ সুদানে। দেশটির স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৮। তার পর সর্বোচ্চ দুর্নীতির মাত্রা সোমালিয়া, ভেনেজুয়েলা, সিরিয়ায়।