সংবিধান সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে নতুন ধারার সংসদ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। চার বছর মেয়াদি ৫০৫ জন এমপির সংসদ হবে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সমন্বয়ে। আইন পাসের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে নতুনত্ব।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, অর্থবিল ছাড়া নিম্নকক্ষের সদস্য তাদের মনোনয়নকারী দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন বিরোধীদলীয় এমপিরা। অন্যদিকে সংবিধান সংশোধনে উভয়কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত সংশোধনী উভয় কক্ষে পাস হলে এটি গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। গণভোটের ফলাফল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যেতে পারে বলে সুপারিশে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সুপারিশে একজন সংসদ সদস্য একই সঙ্গে একটির বেশি পদে অধিষ্ঠিত হবেন না।
শনিবার সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ ৬ সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে প্রধান করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে। এর আগে কমিশন তাদের সুপারিশের সার-সংক্ষেপ প্রকাশ করে।
চূড়ান্ত সুপারিশে সংসদে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশি সরকার, বিদেশি কোম্পানি, বা বাংলাদেশে নিবন্ধিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির সঙ্গে কোনো চুক্তি নিম্নকক্ষে উপস্থাপিত হতে হবে। জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এমন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের আগে আবশ্যিকভাবে আইনসভার উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় গোপনীয়তা রক্ষা করে আলোচিত হবে। এতে বরা হয়েছে- উভয় কক্ষের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ফলে যেকোনো চুক্তির ব্যাপক পরীক্ষণ সম্ভব, যা ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করবে। চুক্তি সম্পর্কে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা ও বিবেচনার সুযোগও এই প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হয়।
সুপারিশে অভিশংসন প্রক্রিয়া নিয়ে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যেতে পারে। লিখিতভাবে নিম্নকক্ষের মোট সদস্যের কমপক্ষে এক-চতুর্থাংশের স্বাক্ষরে অভিশংসন প্রস্তাব আনার অভিপ্রায় জানিয়ে নোটিশের মাধ্যমে নিম্নকক্ষ থেকে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রস্তাবটি নিম্নকক্ষের মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশের কম নয় এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অবশ্যই পাস হতে হবে। নিম্নকক্ষ অভিশংসন প্রস্তাবটি পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে যাবে, এবং সেখানে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এখানে রাষ্ট্রপতির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকবে। উচ্চকক্ষ অভিশংসন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি নিয়োগ করতে পারবে। এই কমিটির দায়িত্ব হবে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করা এবং শুনানি পরিচালনা করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা। শুনানি শেষে প্রতিবেদন উপস্থাপিত হলে উচ্চকক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং যুক্তি বিবেচনা করবে। রাষ্ট্রপতিকে দোষী সাব্যস্ত অথবা অপসারণ করতে উচ্চকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের প্রয়োজন হবে।
সংসদে আইন পাসের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে- উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করার ক্ষমতা থাকবে না। তবে নিম্নকক্ষে পাসকৃত অর্থবিল ব্যতীত সব বিল উভয় কক্ষে উপস্থাপিত হতে হবে। আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে আনা নিম্নকক্ষের বিল উচ্চকক্ষ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে আইন দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করবে। যদি উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনুমোদন করে তাহলে উভয় কক্ষে পাস হওয়া বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে।
আবার যদি উচ্চকক্ষ কোনো বিল প্রত্যাখ্যান করে তাহলে উচ্চকক্ষ সংশোধনের সুপারিশসহ বিল পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে পাঠাতে পারবে। নিম্নকক্ষ উচ্চকক্ষের প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো, সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। এতে বলা হয়েছে- নিম্নকক্ষে পরপর দুটি অধিবেশনে পাসকৃত বিল যদি উচ্চকক্ষ প্রত্যাখ্যান করে এবং নিম্নকক্ষ যদি এটি আবারও পরবর্তী অধিবেশনে পাস করে, তবে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো যেতে পারে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকাতে পারবে না। উচ্চকক্ষ কোনো বিল দুই মাসের বেশি আটকে রাখলে, তা উচ্চকক্ষ দ্বারা অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।
নতুন ধারার সংসদ গঠন প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশন জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে একটি এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ব্যবস্থা বিরাজ করেছে। তবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাহী কার্যাবলি তদারকির অকার্যকারিতা, দুর্বল প্রতিনিধিত্ব এবং বিভিন্ন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে আইনসভা যথাযথ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। নির্বাহী বিভাগের আধিপত্যের কারণে অর্থপূর্ণ সংসদীয় আলোচনা এবং সংসদের যাচাইবাছাই কার্যক্রম লক্ষণীয়ভাবে সীমিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর ক্রমাগত সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির কারণে জবাবদিহির জায়গাটা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।