বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গুলি চালানোর ঘটনার কোনো তদন্ত শুরু করেনি পুলিশ। গণহত্যা কিংবা গুলি চালানোর ক্ষেত্রে দায়দায়িত্ব কে নিরূপণ করবে- এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি গত ছয় মাসে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ ৮ ফেব্রুয়ারি।
জানা গেছে, প্রাণঘাতী অস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণকারী ৭৪৭ পুলিশ সদস্যের একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। কনস্টেবল থেকে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদমর্যাদার এসব কর্মকর্তা ১৮ থেকে ২১ জুলাই গুলি করেছেন।
সূত্র বলছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ আহ্বান করে। ১৮ থেকে ২১ জুলাই এ চার দিনে দেশে সবচেয়ে বেশি গুলি চলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে। পুলিশের ৩৫৭ সদস্য এ সময় প্রায় ৮ হাজার প্রাণঘাতী গুলি করেন। এতে শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত এবং কয়েক শ আহত হন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১১৫টি মামলা হয়েছে। তবে ডিএমপির ১২টি থানা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) ১০টি থানা এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও নির্বিচার গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশ প্রাণঘাতী গুলি, রাবার বুলেটসহ অন্তত ২৬ হাজার ২৩টি গুলি ছোড়ে। এর মধ্যে শটগানের শিসা কার্তুজ ১২ হাজার ৩৪০টি, চীনের সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু এমএম, এসএমজি, টরাস নাইন এমএম ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি ৪ হাজার ৩১৬টি, পিস্তলের গুলি ২৫৬টি, ৮ হাজার ৯৯৪টি রাবার বুলেট, ১৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৯৮৪টি সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্রেনেড, মাল্টি ইম্প্যাক্ট, কাইনেটিভ ও ভারী বল কার্তুজ রয়েছে।
জানা গেছে, যাত্রাবাড়ীর আন্দোলন দমাতে ওই এলাকায় পুলিশকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের তৎকালীন উপ-কমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসেন। যাত্রাবাড়ী ছাড়াও উত্তরা, চানখাঁরপুল ও মোহাম্মদপুরে ব্যাপক গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। উত্তরায় পুলিশকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন উত্তরা বিভাগের ডিসি কাজী আশরাফুল আজীম ও উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরমান আলী, মোহাম্মদপুরে নেতৃত্বে ছিলেন তেজগাঁও বিভাগের ডিসি এইচ এম আজিমুল হক। চানখাঁরপুল ডিএমপির রমনা বিভাগের মধ্যে। চানখাঁরপুলে নেতৃত্ব দিয়েছেন রমনার ডিসি আশরাফুল ইসলাম এবং লালবাগের ডিসি মাহবুব উজ জামান। সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিবির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও ওইসব এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন।
এদিকে পুলিশ রেগুলেশনেও বলা আছে- পুলিশের গুলিতে কোথাও কোনো হত্যাকা ঘটলে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে দায়দায়িত্ব নিরূপণ করা হয়। কার কারণে কিংবা কী কারণে হত্যাকা টি ঘটেছে, আর এর প্রেক্ষিতে কী করা যেতে পারে বা শাস্তি কী হতে পারে তারও একটি সুপারিশ তুলে ধরে পুলিশের গঠন করা তদন্ত কমিটি।
পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে গুলি চালানোর ঘটনায় কার কি দায় তা অনুসন্ধানের জন্য পুলিশ একটি কমিটি করতে পারে। প্রতিটি মেট্রোপলিটন এবং রেঞ্জ আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটিই গুলির নেপথ্যে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে পারবে। কে, কোথায়, কখন দায়িত্ব পালন করেছে তা জানা যাবে। কারণ এটা দেশের জন্য ভবিষ্যতে আর্কাইভ হিসেবেও কাজ করবে এবং এটির গুরুত্ব হিসেবে সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা এ প্রতিবেদককে বলেন, পুলিশ রেগুলেশনেই বলা আছে- কোনো অপারেশনাল কাজে গুলি বা মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটলে দায়দায়িত্ব নিরূপণে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ঘটনায় যেহেতু অনেকের নামে ফৌজদারি মামলা হয়েছে তাই এক্ষেত্রে কমিটি হয়নি।
তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী বলেন, জুলাই-আগস্টে গুলি চালানোয় পুলিশের দায়দায়িত্ব নিরূপণে কাজ চলছে। কিন্তু কয়টি তদন্ত কমিটি হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলে তিনি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ কোনোভাবেই প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালাতে পারে না। পুলিশ যে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে, এর অসংখ্য প্রমাণ আছে। পেশাগত দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও আইনবহির্ভূত আচরণ। তদন্ত কমিটি গঠন করে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে সৃষ্ট অপরাধের দায় নিরূপণ করা একান্ত প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।