আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন চূড়ান্ত করার দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে রিহ্যাব আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট মো. ওয়াহিদুজ্জামান এ দাবি জানান। সম্মেলনে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ ইঞ্জি. আবদুল লতিফ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) আবদুর রাজ্জাক, রিহ্যাব পরিচালক প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লাবিব বিল্লাহ, রিহ্যাব পরিচালক দেওয়ান নাসিরুল হক, মো. কামরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। লিখিত বক্তব্যে প্রসিডেন্ট মো. ওয়াহিদুজ্জামান আরও বলেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের করা নতুন ড্যাপে ভবনের উচ্চতা কমানোর কারণে আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ থমকে গেছে। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প নিতে পারছে না। ফলে কাজ না থাকায় অনেকেই বেকার হয়ে পড়ছেন। এই বেকার জনগোষ্ঠীর অনেকে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। নতুন ড্যাপের কারণে ঢাকা মহানগরের ৮০ শতাংশ অপরিকল্পিত থেকে যাবে এমন মন্তব্য করে ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, জনসংখ্যাবহুল এ দেশে কোনোভাবেই ভবনের উচ্চতা কমানো কাম্য নয়। উচ্চতা কমে যাওয়ার কারণে শহর একটা মারণফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে। কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে বহু মানুষের প্রাণহানি হবে। উদ্ধারকর্মীরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবেন না। এই বৈষম্যমূলক ড্যাপের জন্য কিছু পরিকল্পনাবিদ নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মায়াকান্না করছেন এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রায় আড়াই বছর আগে বৈষম্যমূলক ও ত্রুটিপূর্ণ ড্যাপ প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই ক্ষোভ জানাচ্ছেন জমির মালিকেরা। ড্যাপ সংশোধনের জন্য রিহ্যাব সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসংখ্যবার সভা করেছে। নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বাস দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আবাসন ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
হুমকিতে শহরের বাসযোগ্যতা -বিআইপি : বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণবিধিমালা সংশোধন করার যে প্রক্রিয়া চলছে তা বাস্তবায়ন হলে শহরের বাসযোগ্যতা, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থকে হুমকিতে ফেলবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) নেতারা। তারা বলেন, ঢাকা শহর এমনিতেই বাসযোগ্যতার তলানিতে অবস্থান করছে। যদি ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণবিধিমালা সংশোধন করে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়িয়ে দেওয়া হয় তাহলে ঢাকা বসবাসের একবারেই অযোগ্য হয়ে যাবে। গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরের প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি আয়োজিত ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণবিধিমালা সংশোধন জনস্বার্থ, পরিবেশ ও বাসযোগ্যতার সংকট : নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
তারা আরও বলেন, ঢাকা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, পরিবেশদূষণের শহর। এই শহরের জনঘনত্ব বৈশ্বিক যে কোনো সূচকের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এই শহরের অবকাঠামো ও পরিষেবার ধারণক্ষমতার তুলনায় ইতোমধ্যে কয়েক গুণ বেশি জনসংখ্যা ধারণ করে আছে। আর ঢাকা মহানগর অবসাযোগ্য হওয়ার পেছনে বিগত সময়ে ইমারত নির্মাণবিধিমালা সংশোধন দায়ী।
সংলাপে বিআইপি সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. আনোয়ার জাহিদ, আরডিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়টির বায়ুম লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) পরিচালক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, পরিবেশকর্মী শরীফ জামিলসহ বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের নেতারা।
বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে ১১ প্রস্তাবনা দিয়েছে বিআইপি। এর মধ্যে আছে- বিগত সময়ে গোষ্ঠীস্বার্থে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিকল্পনায় যেসব পরিবর্তন করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সঠিক তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ; পরিকল্পনা, ইমারত নির্মাণ, উন্নয়ন, পরিবেশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবের বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধনীর ব্যবস্থা গ্রহণ; ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণবিধিমালার সংশোধনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা গোষ্ঠীস্বার্থে কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক যথাযথ আইনিব্যবস্থা নেওয়া; ড্যাপ বাতিলের দাবির মাধ্যমে পরিকল্পনাবিহীন উন্নয়নের পেছনে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠীস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর অনুসন্ধানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া; মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নে ও পুনর্মূল্যায়নে শহরের বাসযোগ্যতা, ধারণক্ষমতা, নাগরিক সুবিধার সুষম বণ্টন; এলাকাভিত্তিক সাম্য, পরিবেশ, জলাশয়-জলাধার, কৃষিভূমি রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত ইত্যাদি।