আদালতের চূড়ান্ত রায়ে দণ্ডিত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতির বা নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক ক্ষমা প্রদর্শনের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বোর্ড প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। ওই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রায় ৩৫২ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, বিচারাঙ্গন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, মোবাইল কোর্টে দণ্ড দেওয়ার পরিবর্তে শুধু জরিমানার বিধান করা, আদালতের বিকেন্দ্রীকরণসহ ৩২ বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে এ প্রতিবেদন তুলে দেন বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান। এ সময় কমিশনের অন্য সাত সদস্য উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদন দাখিল শেষে কমিশনের অন্যতম সদস্য সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মাসদার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। প্রতিবেদন দাখিল শেষে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আমাদের একটি বৈঠকও হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের কাজের প্রশংসা করেছেন।’
কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন হাই কোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, সাবেক বিচারপতি মো. ফরিদ আহমদ শিবলী, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজ হক সুপণ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিম হোসেইন শাওন এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আরমান হোসাইন। এ প্রতিবেদনের ৩২ বিষয়ের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ ও শৃঙ্খলা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ ও চাকরির শর্তাবলি, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস, বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট সংবিধান সংশোধন, অধস্তন আদালতের সাংগঠনিক কাঠামো, বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা, বিচার কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, অধস্তন আদালতের ভৌত অবকাঠামো, আদালত ব্যবস্থাপনা অন্যতম। এ ছাড়া বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি, বিচার বিভাগের দুর্নীতি প্রতিরোধ, আইনগত সহায়তা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, মামলাজট হ্রাস, গ্রাম আদালত, আইনের সংস্কার, বিচারক ও সহায়ক জনবলের প্রশিক্ষণ, আইন পেশার সংস্কার, আইন শিক্ষার সংস্কার, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ উন্নয়নেও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারকদের ছুটি, বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন, আদালতে প্রকাশ্যে পরবর্তী তারিখ ঘোষণা না করা, আইনজীবীর মৃত্যুতে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রাখা ইত্যাদি কারণে বিচারপ্রার্থীরা যে হয়রানির শিকার হন, তা বন্ধ করতে হবে।
দণ্ডিত অপরাধীকে ক্ষমায় ছয় সদস্যের বোর্ড : চূড়ান্ত রায়ে দণ্ডিত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতির বা নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক ক্ষমা প্রদর্শনের একক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে অ্যাটর্নি জেনারেলকে চেয়ারম্যান করে একটি বোর্ড গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। বোর্ডে সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদ মনোনীত সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য, বিরোধীদলীয় একজন সংসদ সদস্য, কারা মহাপরিদর্শক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মনোনীত একজন সিভিল সার্জন ও একজন মনোবিদকে রাখতে বলা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্ষমা প্রদানের এ ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। চূড়ান্ত বিচার শেষের আগে একই ব্যক্তিকে দুবার ক্ষমা করার ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা একটি স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপরাধীর শাস্তি হ্রাস কিংবা ক্ষমা প্রদর্শনের এ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও সে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আমাদের রাষ্ট্রপতিরা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক এ শাস্তি হ্রাস বা ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা ব্যবহারের কিছু নিয়মনীতি লিখিত বা অলিখিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব নিয়মনীতির পেছনে বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতেরও ব্যাপক ভূমিকা আছে।
ক্ষমা প্রদানের বিষয়ে বর্তমান আইনি বিধান তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দ মার্জনা, দ মওকুফ, দ হ্রাস, দ স্থগিত এবং দ বিলম্বের বিষয়গুলো বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১, ৪০২ ও ৪০২ক ধারা অনুসারে পরিচালিত হয়।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকার যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে তা সর্বজনবিদিত। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারকাজ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে, একই অপরাধীকে দুবার ক্ষমা প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষমা প্রদর্শনের এ ঘটনাগুলো আমাদের দেশে আইনের শাসনের ধারণা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এ বিষয়ে আইন করার সুপারিশ করে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ক্ষমা প্রদার্শন আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ অন্য সব নির্বাহী ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা এ আইনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হবে। এ আইনের মাধ্যমেই গঠিত হবে ক্ষমা প্রদর্শন বোর্ড।
ওই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী দপ্তরের ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আর ক্ষমা প্রদর্শনের সুপারিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বোর্ডকে নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। ক্ষমাপ্রার্থী দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি নির্ধারিত ফরমে অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিবরাবর ক্ষমা প্রদর্শনের আবেদন করবেন। সব আবেদন যাচাইবাছাই করে অ্যাটর্নি জেনারেল ক্ষমা প্রদর্শনের বোর্ডের সভা আহ্বান করবেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।