সমগ্র দেশ চারটি প্রদেশে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে জনপ্রশাসনসংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে ভারতের নয়াদিল্লির আদলে রাজধানী ঢাকা ও পাশের নারায়ণগঞ্জ নিয়ে একটি ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে পৃথক করে আরও দুটি বিভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের ‘প্রশাসক’ নাম বাতিল করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কমিশনার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপজেলা কমিশনার নামকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে মেম্বারদের ভোটে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার কথা হয়েছে।
গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। কমিশনের প্রতিবেদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
চার প্রদেশ করার যুক্তি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরকারের কর্মকাে র পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় বর্তমান প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার কাঠামো যথেষ্ট কার্যকর বলে মনে হয় না। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার ফলে মন্ত্রণালয়গুলোয় অতিক্ষুদ্র বিষয়ও সরাসরি সম্পাদনের প্রয়োজন হয়। তাই প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবা সহজতর করতে চারটি পুরনো বিভাগের ভিত্তিতে চারটি প্রদেশ গঠন করে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা কমবে এবং একই সঙ্গে ঢাকার ওপর চাপ হ্রাস পাবে।
ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট সম্পর্কে বলা হয়েছে, রাজধানীর জনসংখ্যা ও পরিষেবার কথা বিবেচনায় রেখে নয়াদিল্লির মতো ফেডারেল সরকার নিয়ন্ত্রিত রাজধানী মহানগর সরকার গঠন করার সুপারিশ করা হলো। অন্যান্য প্রদেশের মতোই এখানেও নির্বাচিত আইনসভা ও স্থানীয় সরকার থাকবে। ঢাকা মহানগরী, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ নিয়ে এর আয়তন নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া ভৌগোলিক ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় কুমিল্লা ও ফরিদপুর পৃথক দুই বিভাগ করতে সুপারিশ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের নাম পরিবর্তন, মামলা গ্রহণের ক্ষমতা : জেলা প্রশাসকদের নাম পরিবর্তন ছাড়াও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের সিআর প্রকৃতির মামলা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি এ অভিযোগ তদন্তের জন্য উপজেলার কোনো কর্মকর্তা বা সমাজের স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে সালিশি বা তদন্ত করার নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হলে থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবেন। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে দেওয়াানি ও ফৌজদারি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পুনঃস্থাপন করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ দুটি সুপারিশ বাস্তবায়নে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে কমিশন।
ওসিকে তদারকি করতে এএসপি মর্যাদার কর্মকর্তা উপজেলায় : থানার জবাবদিহি বাড়ানো এবং ওসির কাজ তদারকিতে উপজেলায় একজন এএসপি পদপর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাকে উপজেলা জননিরাপত্তা অফিসার হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন (সাব রেজিস্ট্রেশন) অফিস আইন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিকাহ নিবন্ধন জেলা কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে।
জেলা পরিষদ ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বাতিল : কিছু জেলা পরিষদ বাদে অধিকাংশেরই নিজস্ব রাজস্বের শক্তিশালী উৎস নেই, আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সেহেতু জেলা পরিষদ বাতিল করার সুপারিশ করেছে কমিশন। পৌরসভার গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার হিসেবে একে অধিকতর শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদটি বাতিল করার সুপারিশ করেছে কমিশন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে উপজেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত না রেখে তাকে শুধু সংরক্ষিত ও বিধিবদ্ধ বিষয় যেমন আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ইত্যাদি দেখাশোনার ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
মেম্বারদের ভোটে হবেন ইউপি চেয়ারম্যান : জনগণের ভোটে নয়, মেম্বারদের ভোটে নির্বাচিত হবেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সুপারিশে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর মেম্বারদের আর গুরুত্ব দেন না।
ন্যায়পাল নিয়োগের সুপারিশ : সংবিধানের ৭৭ ধারা অনুসারে তিন বছরের জন্য দেশে একজন ন্যায়পাল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক বা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে জনপ্রশাসন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য, নির্দলীয় ব্যক্তিকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
প্রশাসনিক সংস্কার : প্রশাসনিক সংস্কারেরও বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। বর্তমানে মোট ৪৩টি মন্ত্রণালয় এবং ৬১টি বিভাগ রয়েছে। এগুলো কমিয়ে মোট ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করা হয়েছে। একীভূত ২৬টি ক্যাডার কমিয়ে ১৩টি প্রধান সার্ভিসে বিভক্ত করা ও তিনটি পিএসসি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। উপসচিব পদে পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ, সরকারি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণের প্রথা বাতিল এবং অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) না করা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রথা বাতিল করার জন্য সুপারিশ করেছে কমিশন।
পিএস এপিএস মন্ত্রীদের পছন্দে : সরকারি কর্মকর্তাদের হয়রানি এড়াতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের পিএস, এপিএস সিভিল সার্ভিসের বাইরে থেকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের জন্য নিরাপত্তাবিধানের সুপারিশ করা হয়েছে।
ভোট দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জন্য স্বাধীন কমিশন : অতীতে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট জালিয়াতি, অর্থ পাচার, দুর্নীতি এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণহত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে জনপ্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের বিষয় বিবেচনার কথা বলেছে কমিশন।