ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের ছয় মাস আজ। গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ পট পরিবর্তনের জন্য আত্মত্যাগ করা পরিবারগুলো এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে দুঃসহ স্মৃতি। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির মামলায় দেশে বিচারের কাঠগড়ায় থাকা শেখ হাসিনা এখনো ভারতে আশ্রয়ে আছেন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছরের জুলাইয়ের গোড়ায় শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মধ্য জুলাইয়ে এসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হামলায় রূপ নেয় গণবিস্ফোরণে। সরকারের অত্যাচার-নিপীড়নের সঙ্গে যোগ হয় স্বৈরাচারের আজ্ঞাবহ কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তার মানবাধিকারবিরোধী নৃশংসতা। নির্বিচার গণহত্যা নিশ্চিত করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন।
আওয়ামী লীগ সরকারের দমনপীড়নের সামনে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। তরুণ, যুবা, গৃহিণী, অভিভাবক সবাই স্বৈরাচরের রাহুমুক্ত হতে একজোট হয়েছিল রাজপথে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে উঠে আসে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা। এ গণদাবি সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়। সরকারের পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের গুলি, হত্যার বীভৎসতায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন রূপ নেয় অভ্যুত্থানে। প্রবল জনরোষের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ওই দিন দুপুরেই সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। এরপর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার ১ হাজারের বেশি মানুষ। চোখের আলো নিভে গেছে ৪০০ জনের। শরীরে বুলেটের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে শত শত মানুষ। হাসিনার সময়ে বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পদ্মা সেতু। এছ াড়া পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে প্রভৃতি প্রকল্পের নির্মাণব্যয় কোনো কারণ ছাড়াই দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক, রেলপথ ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বাংলাদেশে। এ ছাড়া মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর প্রভৃতি প্রকল্পের ব্যয়ও অনেকটা বেড়েছে। তবে এসব প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বিচার করতে সংশোধনপূর্বক বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। গণহত্যায় জড়িত অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও শত শত নেতাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে হাসিনাকে প্রত্যাবাসনের জন্য ভারতকে চিঠি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।