রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অপসারিত মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন প্রায় সব উন্নয়নকাজ ঘনিষ্ঠজনদের দিয়েছিলেন। কাজ পাওয়া অনেক ঠিকাদার ৫ আগস্টের পর পালিয়েছেন। ফলে উন্নয়নকাজ থমকে গেছে। একই কারণে শুধু রাজশাহী নয় বগুড়া, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলমান উন্নয়নকাজ শেষ হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। এতে ভোগান্তি বেড়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের।
জানা যায়, ৫ আগস্টের আগে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজের ৪৬টি প্যাকেজের দরপত্র হয়েছিল। এর মধ্যে মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌরিদ আল মাসুদ রনির মালিকানাধীন রিথিন এন্টারপ্রাইজ ও এআর কনস্ট্রাকশন সাতটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছিল। এ ছাড়া কাশিয়াডাঙ্গার মোখলেসুর রহমান মুকুলের মুন এন্টারপ্রাইজ করছিল ছয়টি প্যাকেজের কাজ। যুবলীগ নেতা রনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সামনে থাকতেন এবং টাকার জোগান দিতেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার মিছিলে হামলার নেতৃত্বে ছিলেন রনি। ইতোমধ্যে তার নামে নগরীর বিভিন্ন থানায় দুটি হত্যাসহ একাধিক মামলা হয়েছে। যুবলীগ নেতা রনি ও মুকুলের পাওয়া ১১টি প্যাকেজের কাজ এখন চলছে হাতবদল করে। বিএনপিপন্থি মিলু নামের এক ঠিকাদার এসব কাজ করছেন।
রাজশাহী নগরীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুরের সৌন্দর্যবর্ধন ও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণে ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কাজটি পেয়েছিল যুবলীগ নেতা রনির রিথিন এন্টারপ্রাইজ। এ প্যাকেজের ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে রিথিনকে ইতোমধ্যে ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নগরীর ধর্মসভা মন্দির ও ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনের ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কাজটিও রনি করছিলেন। ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্নের কথা বলে তাকে ৮৭ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। রনির এই দুটি বড় কাজ সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে, ঠিকাদার সেই মিলু।
নগরীর রামচন্দ্রপুর এলাকার বিহারি পুকুর, টিকারপাড়া গোরস্তানের অভ্যন্তরে থাকা দুটি পুকুরের সৌন্দর্যবর্ধনের ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার কাজটিও রনিকে দেওয়া হয়েছিল। ৮৩ ভাগ কাজ হওয়ার কথা বলে জুনে তাকে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এ কাজটিও করছেন মিলু ও তার লোকজন। নগরীর আরও তিনটি ওয়ার্ড এলাকার সিসি সড়ক ও নর্দমা নির্মাণ প্যাকেজের ৫ কোটি ৬ লাখ টাকার কাজ রনির রিথিন এন্টারপ্রাইজ করছিল। এ কাজের বিপরীতে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে। রনি আত্মগোপনে যাওয়ার পর সেই কাজগুলো হাত বদল হয়েছে। এদিকে রনির আরেকটি প্রতিষ্ঠান এআর কনস্ট্রাকশন নগরীর ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ এবং নগরীর আরও ৬টি ওয়ার্ড এলাকার সড়ক, ফুটপাত, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে ১৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ করছিল। এসব কাজের বিপরীতে জুনে রনিকে ৬ কোটি ৫ লাখ টাকার চলতি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
জানা যায়, রনির এআর কনস্ট্রাকশন ও এমএস আলাউদ্দিন ট্রেডার্স নামের প্রতিষ্ঠান দুটি যৌথভাবে নগরীর ছয়টি ঈদগাহ মাঠের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা কাজ করছিল। এ কাজের বিপরীতে ঠিকাদারদের ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, নগরীর মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম আলাউদ্দিন রনি এআর কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজটি নিয়ে নিজেই করছিলেন। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন পলাতক।
নগরীর পদ্মা বাঁধের ওপর ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় একটি ঝুলন্ত সেতু, সিঅ্যান্ডবি মোড়ে ৫ কোটি ২ লাখ টাকার বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের কাজ করছিল মুকুলের মুন এন্টারপ্রাইজ। এ দুটি কাজের জন্য মুকুলকে ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়েছে। রাজশাহী জজ কোর্টের সীমানাপ্রাচীর, নর্দমা, কার্পেটিং সড়ক নির্মাণের ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকার কাজটিও করছিলেন মুকুল। এ কাজের বিপরীতে মুকুলকে ১ কোটি ২১ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নগরীর কেশবপুর দক্ষিণপাড়া, কোর্ট স্টেশন পূর্ব ও পশ্চিমের তিনটি জলাশয় সৌন্দর্যবর্ধনের ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকার কাজও মুকুল করছিলেন। জায়গা নিয়ে জটিলতা থাকায় কাজগুলো শুরু হলেও অগ্রগতি হয়নি। এর পরিবর্তে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বুলনপুরের পুকুর সংস্কারের কাজ করে মুকুল ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা বিল তুলেছেন। নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে সিসি সড়ক ও নর্দমা নির্মাণে ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার কাজের বিপরীতে মুকুল বিল তুলেছেন ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে কাজটির অর্ধেক এখনো বাকি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের ১১ কোটি ১৮ লাখ টাকার একটি বড় কাজ মুকুল করছিলেন। এ কাজের বিপরীতে তিনি ১ কোটি ২ লাখ টাকার বিল পেয়েছেন। আরেক আওয়ামী লীগ নেতার প্রতিষ্ঠান ডন এন্টারপ্রাইজ সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজ করছিল। কাজটি এখন পর্যন্ত ৩৫ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে এর বিপরীতে ডন এন্টারপ্রাইজকে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
জানা যায়, নগরীর ১৬, ১৭ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডেও নর্দমা নির্মাণ করছিল আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজ কবীর মুক্তার প্রতিষ্ঠান সাবিনা এন্টারপ্রাইজ। ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কাজটি শুরু হলেও মাঝপথে বন্ধ হয়েছে। এ ছাড়া রূপপুরের কেলেঙ্কারির হোতা মজিদ সন্স রাজশাহী সিটি করপোরেশনে করছে ২১৫ কোটি টাকা কাজ। নগরীর বিলসিমলা ফ্লাইওভার নির্মাণে ৮৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কাজের বিপরীতে ৮ কোটি ৩১ লাখ ৬৬ হাজার বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি কাজটি শুরু হয়েছে। নগরীর শালবাগান বাজার নির্মাণের ৪১ কোটি টাকার কাজটিও করেছে মজিদ সন্স। তবে কাজটি শুরুর পরপরই ৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর ঠিকাদার পলাতক থাকায় কিছু কাজ বন্ধ ছিল। তবে তাদের পক্ষে এখন অন্যরা এসে পড়ে থাকা কাজ শেষ করতে চেয়েছেন। যেই করুক তাতে রাসিকের আপত্তি নেই।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থমকে গেছে করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত বগুড়ার ফতেহ আলী সেতু নির্মাণকাজ। এতে দুর্ভোগে পড়েছে পূর্ব বগুড়ার তিন উপজেলার প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ। বগুড়া সড়ক বিভাগ বলছে, গত বছরের মে মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও নানা জটিলতায় এখনো তা শেষ হয়নি। ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হয় বগুড়া ফতেহ আলী সেতুর নির্মাণকাজ। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাস্তবে কাজ হয়েছে অর্ধেকের বেশি। সেতুর নির্মাণকাজ বর্ধিত সময়েও শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাফেরার জন্য পাশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। এতে পারাপারে দেখা দিয়েছে ঝুঁকি। ৬৯ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১২ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থ দৃষ্টিনন্দন সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর ঠিকাদার নিয়োগ করে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। বগুড়া সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জানান, চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এজন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় নির্মাণকাজ জানুয়ারি মাসেও শেষ করা যায়নি।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর আলম সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তিনি টিপু মুনশির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। কল্যাণী ইউনিয়নের বড় দরগা বাজার থেকে নব্দীগঞ্জ বাজার পর্যন্ত সড়ক মেরামতে প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি কাজ পেয়েছিলেন তিনি। ৫ আগস্টের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ফলে রাস্তার কাজ বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
পীরগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আরিফুল হক লিটন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ভাগ্নে, তার অধীনে কয়েকটি রাস্তার কাজ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন স্কুলের ওয়াশ ব্লকের কাজ ছিল। তিনি আত্মপোপনে থাকায় ওই সব কাজ বন্ধ রয়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক-রাজশাহী, বগুড়া ও রংপুর]