আসছে ২০২৫-২৬ বাজেটে খরচের লাগাম টানার পরিকল্পনা করছে সরকার। এজন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো প্রকল্প নেওয়া হবে না এবারের বাজেটে। যেহেতু এটি একটি বিশেষ ধরনের সরকার, এজন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো বরাদ্দও না রাখার পক্ষে মত দিয়েছে অর্থবিভাগ। অর্থ বিভাগ মনে করে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক জঞ্জাল কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এজন্য একদিকে আর্থিকসংকট, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম চালানোর মধ্যেই ভারসাম্যহীনতার দিকে চলে গেছে সামষ্টিক অর্থনীতি। বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। আবার কমে গেছে সরকারের রাজস্ব আদায়। এদিকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে করকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে এনবিআর। তবে বাজেটে নতুন করে করের বোঝা চাপানো হবে না বরং করনেট বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
অর্থবিভাগ সূত্র জানায়, আসছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং খাদ্য, আবাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন করে সমতাভিত্তিক দেশ গঠন করা। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে বিভিন্ন রকম সংস্কার কার্যক্রম, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান-বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
তবে যেহেতু বর্তমান সরকার শুধু রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দায়িত্ব নিয়েছে এজন্য সবার আগে প্রয়োজনীয় জরুরি সংস্কারমূলক কার্যক্রম শেষে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করবে। আসছে বাজেটে এসব বিষয়কেও প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও এটা বেশ আগাম প্রস্তুতিই বলে মনে করে অর্থবিভাগ। কেননা, নিয়ম অনুযায়ী বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয় মার্চে। কিন্তু এবার দেশে বিশেষ ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করায় এবং বিশেষ সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাজেট সংশোধন ও প্রণয়নের কাজ একত্রে শুরু করা হয়েছে। অর্থবিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কামূলক কাজে হাত দিয়েছে সেগুলো করতে সময়ের প্রয়োজন। তার চেয়েও বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সহযোগিতা। আসছে বাজেটে হয়তো তারই একটা প্রতিফলন থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
জানা গেছে, ডিসেম্বরের শেষদিকে সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিনের নেতৃত্বে সরকারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সভার একটি সূত্র জানায়, আগের সরকারগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় রাজস্ব বোর্ডকেন্দ্রিক যেসব সিদ্ধন্ত নেওয়া হয়েছিল সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত এবার নেওয়া হবে না। করনেট ও কর আদায় বৃদ্ধির জন্য কঠোর কিংবা অপ্রিয় সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন করা হবে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে শতাধিক পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়নো হয়েছে। যেখান থেকে অতিরিক্ত অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসবে। অবশ্য সরকারি কমকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ ভাতা দিলে সেখানে অন্তত ৭ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে সরকারকে। যা দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।
অর্থবিভাগের একটি সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতি কমাতে ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এই প্রথম নিয়ন্ত্রণমূলক বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য পাবলিক সেক্টরের ব্যয়ের লাগামও টানা হচ্ছে। সেই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়ের লাগামও আপাতত টেনে ধরার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এতে করে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ কমে আসবে। যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে আইএমএফ ও অর্থবিভাগ। এমনিতেই দেশের অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। এমন শ্লথ গতি অন্তত দুই বছর থাকবে। ফলে চলতি বছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে। দুই বছর পর এই প্রবৃদ্ধি বাড়তে শুরু করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। এজন্য আপাতত নিয়ন্ত্রণমূলক বাজেট দিয়ে অর্থনীতির অচলবস্থা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে যে কোনো মূল্যে বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে না পারলে মূল্যস্ফীতির লাগাম কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না বলে মনে করে আইএমএফ। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, আসছে বাজেটের প্রাথমিকভাবে আকার নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা। এটা এখনো চূড়ান্ত নয়। আসছে বাজেট প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আসছে বাজেটে অপ্রয়োজনীয় কোনো প্রকল্প নেওয়া হবে না। প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশি অর্থায়নের তুলনায় বিদেশি অর্থায়নে নজর থাকবে বেশি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও কোনো প্রকল্প নেওয়া হবে না।