বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে হলে দলটিকে ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতৃত্ব নিয়ে আসতে হবে। জুলাই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার জন্য তাদের ‘ভালোভাবে ক্ষমা’ চাইতে হবে। এ ছাড়া হত্যাকান্ডে জড়িত নেতাদের বিচার সম্পন্ন হতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলেই কেবল বাংলাদেশে রাজনীতির সুযোগ পাবে আওয়ামী লীগ।
গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘‘রাজনীতিতে ফিরতে আওয়ামী লীগকে জুলাই-আগস্ট হত্যাকান্ডের জন্য ‘ভালোভাবে ক্ষমা’ চাইতে হবে এবং ‘ক্লিন’ নেতৃত্ব নিয়ে আসতে হবে।’’
প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নিয়ে সরকারের সুপারিশ তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ ও সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি। ব্রিফিংয়ে জুলাই সনদ নিয়ে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে শেখ হাসিনার কন্যা পুুতুলকে সরানোর বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুদক চিঠি পাঠাবে বলেও জানানো হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে ১৪০ জন সাংবাদিককে হত্যা মামলায় জড়িত করার বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শফিকুল আলম বলেন, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জানার ভুল আছে। তারা বলেছে, ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে। আসলে মামলা সরকার কিংবা পুলিশ করেনি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা মামলা করেছেন। এখানে সরকারের কোনো হাত নেই।’ প্রতিবেদনের এ বিষয়টি হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সংশোধন করতে বলা হবে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া এ মামলাগুলো যাচাইবাছাই করতে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কাজ করছে জানিয়ে প্রেস সচিব আরও বলেন, এরই মধ্যে সেই কমিটি মামলায় অভিযুক্ত এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শুনতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে আগামী মাসে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে প্রেস সচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আরও অনেকেই জুলাই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে এসেছে যে, শেখ হাসিনা নিজেই গুম-খুনের নির্দেশ দিয়েছেন। এত বড় একটা হত্যাকান্ড হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে; একদম আপনার-আমার চোখের সামনে দিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের খুন করা হলো; অনেকে অন্ধ হয়ে গেছে, অনেকে সারা জীবনের জন্য অঙ্গ হারাল-তারপরও তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; বরং তারা আরও মিথ্যা বলছে, তিন হাজার পুলিশ মারা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে যতদিন না আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইছে, যতদিন না তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, যতদিন না তারা জবাবদিহির মধ্যে আসছে, ততদিন তাদের কোনো কর্মসূচি করতে দেওয়া হবে না। আমাদের স্পষ্ট অবস্থান, বাংলাদেশে তাদের আগে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।’
আওয়ামী লীগে যারা হত্যাকান্ডে জড়িত নয়, তৃণমূলে যারা কাজ করে-যারা ক্লিন ইমেজের তারা দলটির কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, ‘খুব ভালোভাবে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ক্লিন একটা লিডারশিপ আসতে হবে। এ সময় তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আওয়ামী লীগে যারা ক্লিন আছে, যারা এ হত্যাকান্ডে জড়িত না- তারা কি অনুতপ্ত হয়েছে? তারা কি বলেছে, আমাদের পার্টি এ কাজটা করেছে, আমরা ক্ষমা চাই। তিনি বলেন, কিলিংগুলা দেখেন, ৭১টা শিশুকে তারা মেরেছে। হেলিকপ্টার দিয়ে মারছে। আওয়ামী লীগ তাদের সম্পদ না হলে-দলটির কে এসে বলছে, আমি হাসিনার লিডারশিপ মানি না, একটা ক্লিন লিডারশিপ চাই। কে এসে অনুতপ্ত হচ্ছে, বরং এদের অনেকে মিথ্যা কথা বলছে।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলের সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেস সচিব বলেন, ‘আলোচিত আইনটি নিয়ে অনেক মতামত আসছে। আমরা সমস্ত মতামত সম্মান জানাই। এ সরকার এমন কোনো আইন করবে না যেটা জনগণের কথা বলার অধিকার ক্ষুণœ করবে। আগের আইনটি যেহেতু রদ করা হয়েছে, সেজন্য আমরা শূন্যতা পূরণে দ্রুত একটা অধ্যাদেশ জারি করেছি।’
গত ছয় মাসে ব্যবসাবাণিজ্যে স্বস্তি আনার মতো পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার-সিপিডির এ বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, ‘সিপিডি এ তথ্য কোথায় পেয়েছে আমরা জানি না। গত ছয় মাসে এ সরকারের যে অর্জন এটা অভূতপূর্ব। স্টক মার্কেটে প্রত্যেকটা কোম্পানি প্রফিট ঘোষণা করেছে। রপ্তানি বাড়ছে।’ এ সময় (সোমবার) বেপজার সাংবাদিক সম্মেলনে বিদেশি বিনিয়োগ কমার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে প্রেস সচিব জানান, চারটা কোম্পানি বন্দরে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে আসছে-আমরা তাদের বানিয়ে নিয়ে আসিনি। যেটা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের ধারাবাহিকতায় কিছু বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ না আসার বড় কারণ ছিল, বিগত সরকারের আমলে বছরের পর বছর বিদেশি কোম্পানিকে লভ্যাংশ ফেরত নিতে দেওয়া হয়নি। এয়ারলাইনস, মেটলাইফ, শেভরন কেউ লভ্যাংশ নিতে পারেনি। আমরা এসে শেভরনের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছি ছয় মাসের মধ্যে লভ্যাংশ ফেরত নেওয়ার।
তিনি আরও বলেন, ‘আগের সরকার ১০০টি ইকোনমিক জোন করে পুরো জমিজমা দখল করে বসে ছিল। এখন সেখানে না হচ্ছে কোনো বিনিয়োগ, না ধানের চাষ। আমরা সেখানে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কোরিয়ান ইপিজেডের জমির সমস্যা ২০ বছরেও সমাধান হয়নি। এ মাসের মধ্যে তাদের সমস্যা সমাধান হবে।’
শফিকুল আলম বলেন, ‘বেশ কিছু ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার কথা অনেকে হাইলাইট করছেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর কিছু ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়, কিছু ফ্যাক্টরির জন্ম হয়। কিছু কিছু ফ্যাক্টরি বড় হয়। যে ফ্যাক্টরি ২০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করত-সেটা ৫০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করছে।