ক্রমেই জোরালো হচ্ছে দ্রুত নির্বাচনের দাবি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথমদিকে কিছু দল পূর্ণ সংস্কারের পর নির্বাচনে কথা বললেও বর্তমানে প্রায় প্রতিটি দলই দ্রুত নির্বাচনের কথা বলছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ বড়-ছোট প্রায় সব রাজনৈতিক দলই বলছে, বর্তমান সরকার সাড়ে পাঁচ মাস অতিক্রান্ত করলেও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কখন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে এ নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। নির্বাচন নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা বলাও হচ্ছে। ধোঁয়াশা কাটাতে অবিলম্বে রোডম্যাপ ঘোষণা করে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন চায় দলগুলো। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে ভোটের আয়োজন করা।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বলেন, সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বক্তবে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব বাধা-বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে যত দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে হাঁটবে, ততই ভালো। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জনগণের নির্বাচিত সরকার গঠন করতে হবে। এই সরকারকে সেই পথে পা রাখতে হবে।
দিন যতই যাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিও তত বাড়ছে। ভোটাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ এবং ভোটাররা। তাদের বক্তব্য আর কথাবার্তায় জোরদার হচ্ছে নির্বাচনের দাবি। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, তারা মূলত নির্বাচনি রোডম্যাপের প্রতিই গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের প্রধান বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি শুরুতে সরকারকে যৌক্তিক সময় দেওয়ার কথা বললেও এখন আগামী জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যেই নির্বাচন চাইছে। শুধু বিএনপি নয়, সমমনা দলগুলোর দাবিও একই। নেতারা বলছেন, গণতন্ত্র উত্তরণের টানা ১৫ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন তাদের নেতা-কর্মীরা। গণ অভ্যুত্থানের সাড়ে পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও জনগণের প্রত্যাশার অগ্রগতি হয়নি। এমনকি গণতন্ত্রের সংকট থেকে উত্তরণে যে নির্বাচন দরকার, এর রোডম্যাপ কিংবা রূপরেখা প্রকাশ করেনি সরকার। এতে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। নির্বাচনি রূপরেখা প্রকাশ করে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান নেতারা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সারা দেশে বড় বড় সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। গত সোমবার সাতক্ষীরায় কর্মীসম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার জন্য যতটুকু সংস্কার করা প্রয়োজন, অতটুকু সংস্কার করে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করুন। সেই নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ।’
দেশের অন্যতম আরেক ইসলামী দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর চরমোনাই বলেন, যৌক্তিক সময়ে নির্বাচন হওয়া উচিত। সরকারের মেয়াদ এক বা দেড় বছরের বেশি হওয়া উচিত নয়। তাদের সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি রোডম্যাপের বিষয়ে বলা উচিত। কারণ সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দল নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে, তাই পরিষ্কার করা জরুরি।
দলগুলো বলছে, নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় দলগুলোর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সরকার সে সম্পর্কে কোনো কথাই বলছে না। তারা বলছে, দলগুলো বলছে, ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার ও নির্বাচনি প্রস্তুতি একসঙ্গে চলতে পারে। সরকারের প্রধান কাজ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে তাদের কথাবার্তা পরিষ্কার নয়। বরঞ্চ তাদের বক্তবে নির্বাচন ঘিরে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, বর্তমান সরকার কোনো কিছুই সমাধান করতে পারছেন না। সরকারের উচিত অবিলম্বে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, নির্বাচন আমাদের জেনারেল ডিমান্ড। আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে কবে নির্বাচন করতে চান সেই তারিখ ঘোষণা করা।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, নির্বাচনি রূপরেখা দেওয়া দরকার। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিশ্রুতি ছিল। আশা করি, যত দ্রুত সম্ভব তিনি একটা রূপরেখা দেবেন।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, সরকার একটা রূপরেখা দিতে পারে, এটা সব মানুষেরই চাওয়া। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই নির্বাচনি রূপরেখা দিতে পারত।
দলগুলোর দায়িত্বশীলরা বলছেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দাবিতে মাঠে নামছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট। এরই মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোট, সমমনা দল, ১২ দলীয় জোটকে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামতে দেখা গেছে। রাজপথে না নামলেও দ্রুত সংস্কার কাজ শেষ করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পক্ষে গণফোরাম ও গণতন্ত্র মঞ্চ। এই দলগুলোর নেতৃত্বের ভাষ্য, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না করলে সরকারের প্রতি জনগণের সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হবে। তাই সবারই চাওয়া দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণা করে নির্বাচন দেওয়া।