সারা দেশে রেল চলাচল বন্ধ হওয়ায় বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন ট্রেনে যাতায়াত করা লাখ লাখ মানুষ। পরিবার-পরিজন নিয়ে স্টেশনে এসে মহাবিপাকে পড়েন তারা। কর্মবিরতি শুরুর পর ২৪ ঘণ্টার বেশি পার হলেও রানিং স্টাফদের সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রত্যাহার হয়নি কর্মসূচিও। কর্মবিরতির কারণে ট্রেন বন্ধ থাকায় রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুর চালিয়েছেন ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। পূর্বনির্ধারিত কর্মবিরতির বিষয়ে জানলেও রেলপথ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে যাত্রীসাধারণের জন্য কোনো ঘোষণা বা বার্তা না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। সারা দেশ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন রেল চলাচল বন্ধের কারণে জনমানুষের ভোগান্তির কথা।
সোমবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। আন্দোলনরত রানিং স্টাফদের সঙ্গে বৈঠক করেও কোনো সমঝোতায় আসতে পারেননি রেল কর্তৃপক্ষ। রানিং স্টাফ নেতারা বলেছেন, তাঁরা আরও আলোচনা করবেন। কর্মবিরতিও চলবে। রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ট্রেনের যাত্রীদের বিআরটিসি বাসে পরিবহনের ব্যবস্থা করে সরকার। সকালে কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘যাত্রীদের জিম্মি করে রানিং স্টাফদের কর্মসূচি দুঃখজনক।’ মূল বেতনের সঙ্গে রানিং অ্যালাউন্স যোগ করে পেনশন এবং আনুতোষিকের দাবি পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী সমিতির এ কর্মবিরতি শুরু হয়। রেলের যাত্রা বাতিল হলে আগের কেনা টিকিটের টাকা রেলওয়ে ফেরত দেবে বলে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। রেল যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার পর রেলের বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রেল রুটে যাত্রী পরিবহনের জন্য বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু করেছে সরকার। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কমলাপুর রেলস্টেশন ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়া ও ময়মনসিংহগামী যাত্রীদের জন্য কেনা রেল টিকিটে বিআরটিসি বাস সার্ভিসের মাধ্যমে ভ্রমণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে এসব স্থান থেকে ঢাকায় এ সার্ভিসের মাধ্যমে আসতে পারবেন। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
বাবা ও সন্তানকে নিয়ে জামালপুরের উদ্দেশে রওনা করতে কমলাপুর স্টেশনে এসেছিলেন শরিফুল ইসলাম। সকালে মগবাজার থেকে কমলাপুর স্টেশনে আসেন তারা। তিনি বলেন, ‘স্টেশনে এসে জানতে পারি ট্রেন চলাচল বন্ধের কথা। অনলাইনে টিকিট করলেও মেসেজ বা কোনো বার্তা দিয়ে বন্ধের বিষয়টি জানানো হয়নি।’ ঘণ্টাখানেক স্টেশনে অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে যান। রেল চলাচল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারী ও শিশুরা।
গতকাল সকালে কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের জিম্মি করে রেলওয়ের রানিং স্টাফদের কর্মসূচি দুঃখজনক।’ এ সময় বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম, রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রেলের কর্মীদের ওভারটাইমের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এখন অন্য দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেখবে।’
ঢাকা রেলস্টেশন থেকে জানা গেছে, প্রতিদিন কমলাপুর থেকে প্রায় ৪০ জোড়া আন্তনগর এবং ২৪ জোড়া মেইল ট্রেন ছেড়ে যায়। গতকাল কোনো ট্রেনই ছেড়ে যায়নি। কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন জানান, কর্মবিরতি করা রানিং স্টাফদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে কখন রেলযাত্রা স্বাভাবিক করা যাবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আন্দোলনরত রানিং স্টাফদের নিয়ে গতকাল দুপুরে বৈঠকে বসেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মো. ফাহিমুল ইসলাম। বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা রেলস্টেশনের ভিআইপি রুমে ওই বৈঠক শুরু হয়। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে বেরিয়ে আসেন রানিং স্টাফ প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি মো. সাইদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মবিরতিতে অনড় আছি।’
সারা দেশে দুর্ভোগ : কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম থেকে গন্তব্যে যেতে পারছেন না যাত্রীরা। তাদের অন্তহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। লালমনিরহাটে কোনো ট্রেন না ছাড়ায় ঢাকা, বগুড়া, গাইবান্ধা ও নাটোরগামী সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা স্টেশনে ভাঙচুর চালিয়েছেন। রাজবাড়ী রেলস্টেশনে আসা যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। গাইবান্ধা রেলস্টেশনে নির্ধারিত শিডিউলের কোনো ট্রেন আসেনি। সিলেট থেকে কোনো ট্রেন ছেড়ে যায়নি। ফলে বিপাকে পড়েন সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী ট্রেনের যাত্রীরা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ঢাকায় অফিসগামী মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় গিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন তাদেরও ভোগান্তি শিকার হতে হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটের দুটি ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রেনের যাত্রীদের বাস কাউন্টারে চাপ বেড়েছে।