ভ্যাট এবং সুদের হার বৃদ্ধিতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। এ কারণে বিনিয়োগ কমছে, নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। উল্টো চাপের কারণে চলমান প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছে।
কয়েক মাসের ব্যবধানে ব্যাংক ঋণের সুদ বৃদ্ধি, ভ্যাটের বাড়তি চাপ, তারল্যসংকট, ডলারের উচ্চমূল্য, জ্বালানি ঘাটতির কারণে তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ ও খেলাপির নতুন নিয়ম শিল্প খাতে সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন বিনিয়োগ দূরের কথা, পূরনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। নতুন করে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। আর নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। এজন্য দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ কারণে অনেকে বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শ্রম অসন্তোষের কারণেও কমেছে বিনিয়োগ। আরও বেশ কিছু কারণে কমছে বিনিয়োগ। গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত কমছে। নভেম্বরে আগের বছরের তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বেনামি-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কমে এসেছে। দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত ও পর্ষদে পরিবর্তন হয়েছে এমন ১১টি ব্যাংকের নতুন ঋণ প্রদান বন্ধ রয়েছে। এর একটি বড় প্রভাব পড়েছে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ খাতে। ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকার চাহিদা মেটাতে এখন হিমশিম খাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে দিচ্ছে। ২২ হাজার কোটি টাকা নতুন করে বাজারে এলেও সেটা বিনিয়োগ খাতে যায়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। নানা জটিলতা ও আমদানি সীমিতকরণের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে চলতি বছরের শুরুতে সরকার নতুন করে ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। সব ধরনের খুচরা পণ্যের ওপর বড় আকারে ভ্যাট আরোপ করা হয়। গুঁড়া দুধ, বিস্কুট, জুস, ফল, সাবান, মিষ্টিসহ ৬৫ পণ্যে ভ্যাট বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভ্যাট বাড়ানোর তালিকায় রয়েছে এলপি গ্যাস, আচার, টম্যাটো কেচআপ বা সস, সিগারেট, টিস্যু পেপার, ডিটারজেন্ট পাউডার, চপ্পল (স্যান্ডেল)। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বিমান ভাড়ায় শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এর চাপ পড়েছে পুরো ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর। অর্থনৈতিক খাতে এমন অস্থিরতার কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই-নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি কমার অর্থ দেশে নতুন বিনিয়োগ কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলা কমেছে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ঋণপ্রবাহের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র। গত নভেম্বরে অর্জিত প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে নিচে রয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জুলাই-ডিসেম্বরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৯ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। সেটা সাড়ে ৭ শতাংশ হয়েছে। এ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ব্যবসাবাণিজ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা চলছে। আগামীতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্যোক্তারা রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনীতির নীতি-পলিসির সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্দশা, গ্যাসের অভাব, জ্বালানি সরবরাহের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতির এ সংকটগুলো কাটেনি বলেই আস্থা পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে আগে ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনতে হবে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আবদুল্লাহ হিল রাকিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। সরকার ভ্যাট, ট্যাক্স বৃদ্ধি করেছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে। ঋণের সুদ ১৫ শতাংশের বেশি। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া শুরু হয়েছে, আরও হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যবসায়ীরা এখন যে সমস্যায় আছেন তা মোকাবিলা করার জন্য যদি নীতিসহায়তা না দেন তাহলে ক্ষতি আরও বড় হবে।