গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, রাষ্ট্র সংকারের জন্য গঠন করা হয়েছে ১১টি সংস্কার কমিশন। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে সব ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ করতেই বর্তমান সরকার কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। হঠাৎ করে যৌক্তিক কারণে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। সেই সঙ্গে বিএনপির মধ্যে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে। বিএনপি মনে করছে, সংস্কার ও বিভিন্ন ইস্যুতে ভোট বিলম্বিত হলে বিশেষ একটি গোষ্ঠী ও পতিত ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর তা হলে অর্থহীন হবে জুলাই বিপ্লব। সে কারণেই দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে শক্ত অবস্থানে বিএনপি। দলটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি। এ নিয়ে কোনো নয়ছয়, কলাকৌশল কিংবা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত বরদাশত করবে না দলটি। ‘অপ্রয়োজনীয়’ সংস্কার প্রস্তাব, গণ অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র ও নতুন দল গঠন- এই তিনটি ইস্যুতে সন্দেহ বাড়ছে বিএনপিতে।
নির্বাচনের বাইরে যারা এসব অপ্রয়োজনীয় ইস্যু সামনে এনে নির্বাচনে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করতে চায়, তাদের ঘিরেই সন্দেহ বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলে। এ জন্যই দ্রুত নির্বাচন ও তার আগে রোডম্যাপ দাবি করা হচ্ছে। শিগগিরই জাতীয় নির্বাচনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না দিলে রাজপথে কর্মসূচি দেওয়ারও চিন্তাভাবনা রয়েছে দলটির। ইতোমধ্যে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই নির্বাচন দাবি করেছেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, সরকার চাইলে চলতি বছরের ৫ আগস্ট আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সম্ভব।
বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারে শিক্ষার্থীদের তিনজন উপদেষ্টা রয়েছেন। তিন উপদেষ্টা সরকারে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক দল গঠন ও নির্বাচন হলে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হবে। তাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এসেছে। তাদের মতে, সরকারের একজন উপদেষ্টা নিরপেক্ষ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপি আরেকটি এক-এগারোর মতো সরকার চায়! এখানে এক-এগারোর মতো সরকারের কথা এলো কীভাবে। আর বিএনপিই সব থেকে বেশি এক-এগারো সরকারের জুলুমের শিকার হয়েছে। তাই বিএনপি এক-এগারোর মতো সরকার চাইছে এই বক্তব্য সাধারণ মানুষ মেনে নেবে না। বিএনপি চায় নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে বাদবাকি সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হোক। সরকার সংস্কারের জন্য বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন করেছে। সংস্কারের জন্য এই কমিশন গঠনের ধারণাও বিএনপির। প্রায় দুই বছর আগে থেকেই বিএনপি তার ৩১ দফা প্রস্তাবে এসব কথা বলে আসছে। সংস্কার কমিশনগুলো সম্প্রতি যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, তার অধিকাংশই বিএনপি অনেক আগেই ঘোষণা করেছে। তারা ক্ষমতায় গেলে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে বলেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এমনকি নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সমমনা দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করার কথা বলেছে দলটি। নির্বাচিত সরকার সবাইকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করবে।
এ বিষয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই এ সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা করে আসছে বলে মনে করেন নেতারা। বিএনপি কখনোই বলেনি সংস্কার চায় না। বিএনপি বলেছে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচন, যা এখন সব রাজনৈতিক দলও চাইছে।
কিন্তু বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের অনেক ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রস্তাব, এত দিন পর গণ অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ এবং সরকারের আনুকূল্যে নতুন দল গঠন- এসব নিয়ে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। এর পেছনে নির্বাচন প্রলম্বিত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কাজেই এ অবস্থায় জনগণ দ্রুত নির্বাচনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চায়। কাজেই রাজনৈতিক বিভেদ আরও বাড়ার আগেই প্রয়োজন সমস্যা সমাধানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ এবং এ নিয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ প্রসঙ্গে বলেন, এসব ওয়ান-ইলেভেনের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। ওয়ান-ইলেভেন পুরোটাই ছিল বিএনপির বিরুদ্ধে। বিএনপিকে টার্গেট করেই ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্প্রতিক ঘটনা যার বড় প্রমাণ। সামনে এসব আরও দেখা যাবে। এর পেছনে একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধন রয়েছে। এ জন্য তারা ওয়ান-ইলেভেনের কথা টেনে মানুষের মনে সন্দেহ বাড়াচ্ছে। কিন্তু জনগণ এসব কিছুতেই গ্রহণ করবে না।