ঢাকার দোহারে থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের প্রায় ২০০ একর জমি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি রাজধানীর গুলশানে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার বর্গফুটের বিলাসবহুল দুটি ফ্ল্যাটও ক্রোক করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার এ আদেশ দেন বিচারক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা এসব সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সিআইডি জানায়, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান অ্যাপোলো অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং কাঁচপুর অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২১টি এলসি/সেলস কন্ট্রাক্ট (বিক্রয় চুক্তি)-এর মাধ্যমে দুবাইয়ে তাঁর ছেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং নামে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে ২৬০ কোটি ১৪ লাখ ৯৮৪ ইউএস ডলারের পণ্যমূল্য রপ্তানি করে অর্থ পাচার করেছেন। এ বিষয়ে মানিলন্ডারিং মামলা তদন্তাধীন আছে। সংঘবদ্ধভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে টাকা পাচারের অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পণ্য রপ্তানি করে। সংঘবদ্ধ অপরাধের মাধ্যমে ঢাকার দোহার উপজেলায় প্রায় ২০০০ শতাংশ জমি অর্থাৎ ২০০ একর, রাজধানীর গুলশানে দ্য ইনভয় নামে ভবনে সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শাহরিয়ার রহমানের নামে থাকা ৬ হাজার ১৮৯.৫৪ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং গুলশান আবাসিক এলাকার ৬৮/এ নম্বর রাস্তার ৩১ নম্বর প্লটে ট্রিপ্লেটস নামে ৬ তলা ভবনের ২য় ও ৩য় তলায় ২ হাজার ৭১৩.১০ বর্গফুটের আরও একটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়েছে।
কারখানা খুলে না দিলে চাকরি হারাবেন ৪২ হাজার মানুষ : বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলো খুলে না দিলে ৪২ হাজার মানুষ চাকরি হারাবেন বলে দাবি করেছেন সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড বা বেক্সিমকোর কর্মীরা। রাজধানীর পুরানা পল্টনে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বেক্সিমকো ফ্যাশন লিমিটেডের অ্যাডমিন বিভাগের প্রধান সৈয়দ মো. এনাম উল্লাহ এবং বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের অ্যাডমিন বিভাগের প্রধান আবদুল কাইয়ুম।
বেক্সিমকোর অস্তিত্বহীন ১৬ প্রতিষ্ঠানের নামে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ : বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে মোট ৩২ কোম্পানির মধ্যে ১৬টির কোনো অস্তিত্ব নেই। নামসর্বস্ব এই ১৬ কোম্পানির নামে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব নামসর্বস্ব কোম্পানি লে-অফ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। গতকাল সচিবালয়ে কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় উপদেষ্টা বলেন, গত ২১ জানুয়ারি বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কর্মচারী ও শ্রমিকরা গাজীপুরের শ্রীপুর মায়ানগর মাঠে জমায়েত হয়ে লে-অফ প্রত্যাহার করে ফ্যাক্টরিগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানান। অস্তিত্বহীন ১৬ কোম্পানির মধ্যে ১২টি ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক লে-অফ করা হয়েছে, যা সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। তিনটি কোম্পানি বর্তমানে চলমান। বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত ৩২টি ফ্যাক্টরির বিপরীতে ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকাসহ বেক্সিমকো লিমিটেডের মোট ব্যাংক ঋণ বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে শুধু জনতা ব্যাংকের পাওনা ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
আরও ৪০০ কোটি টাকা ঋণ চায় বেক্সিমকো : কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা ও রপ্তানি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধ করতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল কারখানাগুলো চালু রাখতে জনতা ব্যাংকের কাছে আরও ৪০০ কোটি টাকা ঋণ চায় বেক্সিমকো টেক্সটাইলস। এ ছাড়া রপ্তানির সুবিধার্থে ব্যাক টু ব্যাংক এলসি খোলার সুযোগ এবং সব দায়দেনা পরিশোধে দুই বছরের মোরাটোরিয়াম সুবিধাসহ ৫ শতাংশ সুদে ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল করার অনুরোধ করেছেন বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী।
বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানা চালু হচ্ছে না : শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, শ্রমিকদের দাবিগুলো অত্যন্ত অযৌক্তিক। বেক্সিমকো গ্রুপের বন্ধ কারখানাগুলো ফের চালু করা সম্ভব নয়। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। ড. সাখাওয়াত বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসা পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির আহ্বায়ক। উপদেষ্টা বলেন, বেশ কিছু দিন আমরা একটা শান্ত পরিবেশে ছিলাম। হঠাৎ তারা (বেক্সিমকোর শ্রমিকরা) সমাবেশ করে বলেছেন তাদের তিনটা দাবি।
দাবিগুলো আমার মনে হয় কোনো সরকারের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। অত্যন্ত অযৌক্তিক এসব দাবি। তারপরও তারা বলেছেন মানববন্ধন করবেন, রাস্তাঘাট বন্ধ করবেন। তারা করেছেনও, আমরা কিছু বলিনি। পুলিশ মোতায়েন ছিল, আর্মি মোতায়েন ছিল, তারাও তাদের বাধা দেয়নি।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করেছিলাম শ্রমিক নেতা যারা আছেন তারা অত্যন্ত রেসপনসিবল। মনে করেছি এবং এখনো মনে করি তারা রেসপনসিবল হিসেবে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরবেন। তাতে কোনো আপত্তি নেই।