ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর চরমোনাই বলেছেন, আগামীতে যে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে তারা যদি অতীত থেকে শিক্ষা না নেয় তাহলে আওয়ামী লীগের চেয়েও শোচনীয় গ্লানি বহন করতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ তিনটি নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষকে যেভাবে ভোটের অধিকারবঞ্চিত করেছে তাতে অন্তত আগামী তিনটি জাতীয় নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারবে না। এ ছাড়া তারা যে অপকর্ম করেছে যেমন খুন, গুম, টাকা পাচার- এই বিচারগুলো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা জাতীয় নির্বাচনে আসতে পারবে না। গত রবিবার ইসলামী আন্দোলনের পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনি প্রস্তুতি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সামগ্রিক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশ কেমন চলছে বলে আপনি মনে করেন।
পীর চরমোনাই : স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, আমরা কোনো দিক থেকেই ভালো করতে পারিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের যে চাওয়া ছিল, বাস্তবে আমরা তা পাইনি। এর কারণ হলো, যেসব দল রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তারা ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে দেশটা ওভাবে উন্নয়ন হয়নি। তবে ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুথানে ৫ আগস্ট দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা লাভের পর নতুনভাবে দেশকে সাজানোর সুযোগ হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সংস্কার কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন?
পীর চরমোনাই : কমিশনগুলো যেভাবে দ্রুত ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজগুলো করার কথা ছিল বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, গত ৫৩ বছর যে পদ্ধতিতে ভোট হয়েছে সবগুলোই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ফ্যাসিবাদের ছোবল, পেশিশক্তি ও কলোটাকার দৌরাত্ম্য এসব কারণে ভালো প্রতিনিধি সংসদে পাঠানো যায়নি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের তিনটি ভোট নির্বাচনের মধ্যেই পড়ে না। দিনের ভোট রাতে, আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছে। পৃথিবীর ৯১টি দেশের মতো পিআর পদ্ধতিতে আমরা নির্বাচন চেয়েছি। পিআর পদ্ধতিতে ভোট হলে বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে অনেক ভালো নির্বাচন হবে। প্রায় সব দলই দেশ পরিচালনায় দায়িত্ব পাবে। এ পদ্ধতি দেশ ও মানবতার কল্যাণের জন্য ভালো। বিএনপি ছাড়া প্রায় সব দল এতে মত দিয়েছে। হয়তো দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে বিএনপি এই পদ্ধতি গ্রহণ করতে চায় না। আগামীতে এই পদ্ধতিতে ভোট হলে হয়তো বিএনপিই সরকার গঠন করবে। কিন্তু এটা তারা চায় না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামী নির্বাচন কবে হওয়া উচিত?
পীর চরমোনাই : বর্তমান সরকারের অনেক উপদেষ্টার যোগ্যতার বিষয়ে প্রশ্ন আসছে। অনেকের বয়সের ব্যাপারেও প্রশ্ন আসছে। সংস্কারের জন্য কিছু সময় লাগবে কিন্তু সময়টা অযৌক্তিক হতে পারে না। সময়টা হতে হবে যৌক্তিক। নিয়ম ছাড়া কিছু করলে মানুষ মেনে নেবে না। দায়িত্ব গ্রহণের এক-দেড় বছরের মধ্যেই নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করবেন বলে আশা করছি। এর ব্যতিক্রম করলে তারা ভুল করবে। উপদেষ্টা পরিষদে এমন কেউ কেউ আছেন যাঁদের ছাত্ররা পছন্দ করেন না, তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেই লোকগুলোকে আমরা পরিবর্তনের দাবি করেছিলাম। সরকার এতে গুরুত্ব দেয়নি। সংবিধান পুরোপুরি পরিবর্তন না করে ফ্যাসিস্ট সরকার সাড়ে ১৫ বছরে দলীয় স্বার্থে সংবিধানে যা পরিবর্তন এনেছে, তা বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় সংযোজন করে সংশোধন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামী নির্বাচন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের প্রস্তুতি কত দূর?
পীর চরমোনই : আমরা নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি। আমরা পিআর পদ্ধতিতে বেশি জোর দিচ্ছি। এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি নয় দলকে ভোট দেবে জনগণ। আগের পদ্ধতিতে ভোট করে কালোটাকা পেশিশক্তিওয়ালাদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য ছাত্ররা জীবন দেয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে হাতপাখা প্রতীকে ভোট করব। জোট করার বিষয়ে সমমনা ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছি। আলোচনা অনেকটা এগিয়েছি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারাও চাচ্ছে এমনটি। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ছাত্রদের নতুন দল গঠনকে কীভাবে দেখেন। আলোচনা রয়েছে কিংস পার্টি গঠন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন বিলম্বিত হবে। কি মনে করেন?
পীর চরমোনাই : রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। মানুষ দেখবে কাদের মাধ্যমে দেশ ভালো চলবে। তাদের জনগণ ভোটের মাধ্যমে বেছে নেবে। তবে তারা দল গঠন না করা পর্যন্ত নির্বাচন বিলম্বিত হবে এমন কোনো কথা আমরা সরকারের পক্ষ থেকে পাইনি। এ কথার কোনো ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামীতে কেমন শাসক হওয়া উচিত?
পীর চরমোনাই : আওয়ামী লীগের শাসনামল ছিল ভারতের স্বার্থে। আওয়ামী লীগ ভারতকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অপশাসনে অতীষ্ঠ হয়ে ৯০ শতাংশ মানুষ ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুথানে অংশ নিয়েছে। এ থেকে যত রাজনৈতিক দল আছে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত। কারণ শিক্ষা না নিলে এর চেয়ে শোচনীয় গ্লানি বহন করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
পীর চরমোনাই : সরকারের উচিত ছিল ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষের আয় কীভাবে বাড়বে সেদিকে নজর দেওয়া। সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে নতুন করে ভ্যাট বসিয়ে দিল। এটি দেশের মানুষের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ভ্যাট বাড়বে, ভ্যাট দিতে হবে, সব ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের আয়ের বিষয়টিও দেখতে হবে। দেশের ব্যবসা সেক্টরগুলো অগোছালো। এখানে সিন্ডিকেট সর্বত্র। এ বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। যেভাবে গুরুত্ব আশা করেছিলাম সেভাবে পাইনি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের ভালো সুসম্পর্ক রাখা উচিত। নইলে দেশ চলবে কীভাবে?
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেন অংশ নিতে না পারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে। আপনি কি মনে করেন?
পীর চরমোনাই : আওয়ামী লীগ গত তিনটি নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষকে যেভাবে ভোটের অধিকারবঞ্চিত করেছে তাতে অন্তত আগামী তিনটি জাতীয় নির্বাচনে তারা যেন অংশ নিতে না পারে। এ ছাড়া তারা যে অপকর্ম করেছে যেমন খুন, গুম, টাকা পাচার এই বিচারগুলো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা জাতীয় নির্বাচনে আসতে পারবে না। এটা দেশের জনগণ এবং ছাত্র-জনতারও দাবি। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য। তাদের খুন-গুমের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজনীতিতে আসতে পারবে না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের দাবি উঠেছে। আপনি কি মনে করেন?
পীর চরমোনাই : ভারতের সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের চুক্তি রয়েছে। অপরাধীর বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। শেখ হাসিনা দেশে এত বড় অত্যাচার, অরাজকতা করল। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তাঁকে ফিরিয়ে না দিলে আন্তর্জাতিক আইন বা তাদের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি তা লঙ্ঘন হবে। এটা হওয়া উচিত না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকারের কাছে প্রত্যাশা কী?
পীর চরমোনাই : গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার জন্য কল্যাণময় দেশ প্রতিষ্ঠার কাজগুলো সরকারের কাছে আশা করছি। বিতর্কিত কাজ যেন তারা না করে। বর্তমান সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ব্যাহত হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মৌলিক চাহিদা যেন পূরণ করতে পারে, সে প্রত্যাশা ও দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
পীর চরমোনাই : বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।