দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করতে কয়েকটি আইন সংস্কারের কথা বলেছে কমিশন। তার মধ্যে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষার আইনও রয়েছে। দুদকের বিধিমালার ৫৪ (২) ধারায় বলা হয়েছে- ‘এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ না দর্শাইয়া কোনো কর্মচারীকে ৯০ দিনের নোটিশ প্রদান করিয়া অথবা ৯০ দিনের বেতন নগদ পরিশোধ করিয়া তাহাকে চাকরি হইতে অপসারণ করিতে পারিবে।’ এজন্য সংস্কার কমিশন বলছে, দুর্নীতির তথ্য যিনি প্রকাশ করেন, তার সুরক্ষায় কার্যকর আইন থাকতে হবে।
দুদককে শক্তিশালী, কার্যকর ও ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে কমিশনারদের পদ বাড়ানো, নিয়োগ, সার্চ কমিটি, আইনের সংস্কার, বেতন বৃদ্ধি ও প্রণোদনা প্রদানের প্রস্তাব। গত বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান। দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও তিন সদস্যের পরিবর্তে পরিসর বাড়িয়ে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। পাঁচ সদস্যের কমিশনে একজন নারী সদস্য যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দুদকের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে, বিচারিক ও আর্থিক খাতের মতো অভিজ্ঞদের যুক্ত করা। একই সঙ্গে কমিশনের মেয়াদ পাঁচ থেকে কমিয়ে চার বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। চাকরিবিধিতে সংস্কারের মধ্যে রয়েছে- সচিব পদ থেকে নিচের দিকের পদগুলোতে নিয়োগ-পদায়নে কমিশনের আইনের বড় পরিবর্তন।
এর মধ্যে সচিব নিয়োগ, মহাপরিচালক পদে কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা থেকে ৬০ শতাংশ পদায়ন ও পদোন্নতি, পরিচালক পদে কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা ৭৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের চাকরি থেকে অপসারণ করারও সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন গঠনে যে দুদক আইনে সার্চ কমিটির কথা বলা রয়েছে সেটি পরিবর্তন করে বাছাই এবং পর্যবেক্ষক কমিটি গঠনের সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনা এড়াতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বাদ দিয়ে তারপর যিনি সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ হবেন, তিনি হবেন বাছাই কমিটির প্রধান। হাই কোর্টের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ একজন সদস্য হবেন, একজন থাকবেন প্রধান বিচারপতির নিযুক্ত, যিনি বাংলাদেশের শাসন সম্পর্কে জানেন। এ ছাড়া মহাহিসাব নিরীক্ষক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে একজন, সংসদ নেতা থেকে মনোনীত একজন সদস্য ও প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা থেকে মনোনীত একজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে বাছাই কমিটি। এ কমিটি কমিশন যাচাইবাছাই করার পাশাপাশি কমিশন কী কাজ করছে তা ছয় মাস পরপর পর্যবেক্ষণ করবে। এ ছাড়া কমিশন গঠনের বিষয়টি এত দিন গোপন থাকলেও এবার তা সবার জন্য উন্মুক্ত করার সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন বন্ধে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি আয়-ব্যয় নিয়মিত প্রকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্কার কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি আয়-ব্যয় নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। হলফনামার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। যদি হলফনামায় পর্যাপ্ত তথ্য না থাকে, তথ্য গোপন করা হয় এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ থাকে, তবে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় থেকে জাতীয়-সব পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তাদের পরিবারের সবার সম্পদের বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দেবেন। সেটি নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করবে। এটি প্রতি বছর হালনাগাদ করতে হবে, যতদিন তারা জনপ্রতিনিধি থাকবেন। এ ছাড়া কমিশনের কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি ও প্রণোদনার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষ পর্যায়ে দুদক সংস্কার কমিশনের উত্থাপিত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প (ছয় মাস), মধ্যম (১৮ মাস) ও দীর্ঘমেয়াদি (৪৮ মাস) পথরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলছে। এর অংশ হিসেবে দুই ধাপে মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে গত ৩ অক্টোবর গঠন করা হয় আট সদস্যের দুদক সংস্কার কমিশন। কমিশনের প্রধান করা হয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানকে।