চলতি বছরেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায় দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি। আর জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন মানবে না দলটি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জন আকাক্সক্ষা প্রাধান্য দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়া। এ ধরনের সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচন হওয়ার নজির নেই। শুধু বিএনপি নয়, বিএনপির সমমনাসহ প্রায় সব দলই বলছে, স্থানীয় নয়, জাতীয় নির্বাচন চায় তারা। বিএনপি নেতৃবৃন্দ মনে করেন, অতিপ্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে জাতীয় নির্বাচন করাও একটা বড় সংস্কার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনের ভাবনা বিএনপির নেই।’ তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের ভোটাধিকার ব্যবস্থা ধ্বংস করে গেছে। দেশবাসী প্রত্যাশা করে বর্তমান সরকার ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেবে।’ সম্প্রতি ‘জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার’, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের এমন বক্তব্যের পর জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে কি না, এ আলোচনা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় নির্বাচন করতে চাইলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই করতে হবে। সংসদ নির্বাচন করার পর তারা আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ পাবে না। বিএনপির দায়িত্বশীলরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নির্বাচন করার কথা ছিল, কিন্তু তারা স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কথা বলছে। তাঁরা বলেন, স্বাধীনতার আগে আইয়ুব খানের শাসনামল ছাড়া কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সরকার নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, এতে জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। তাঁরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় নির্বাচন করার ম্যান্ডেট নেই। আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। নির্বাচিত সরকারই স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন করবে। তাঁরা বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন হবে জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার অভিপ্রায় ও মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা। প্রধান উপদেষ্টার এমন ঘোষণার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়। স্থায়ী কমিটিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন মানা হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপি বাস্তবতার নিরিখে এখনই স্থানীয় নির্বাচন চাচ্ছে না। দায়িত্বশীলারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন হলে স্থানীয়ভাবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করবেন। আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা নিজেদের ঘর গোছানোর সুযোগ পাবে। কারণ তারা সবাই পালায়নি। এমনিতে দেশে প্রতিবিপ্লবের ষড়যন্ত্র চলছে, এ অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচন কাজে লাগিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা মাঠে উঠেপড়ে নামবে। তখন দেশে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়বে। বিএনপি মনে করছে, এ মুহূর্তে দেশে স্থানীয় সরকারের কাঠামো নেই। জনপ্রশাসন শক্তিশালী নেই। তৃণমূলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের যোগাযোগ নেই। সংসদ নির্বাচন হলে তখন একটি কাঠামো তৈরি হবে। নির্বাচিত সরকার স্থানীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেবে। সংসদ নির্বাচনের আগে যাতে স্থানীয় নির্বাচন না হয় এজন্য বিএনপি স্থানীয় সরকার কমিশনের কাছে লিখিত প্রস্তাব ও যৌক্তিক দাবি তুলে ধরবে।
শুধু বিএনপি নয়, বিএনপির সমমনা ১০টি দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হয়। এতেও স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়টি উঠে আসে। বৈঠকে অংশ নেওয়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘জরুরি সংস্কারের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার যদি এটা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা আরও জোরদার করব। যত তাড়াতাড়ি সরকার জাতীয় নির্বাচন দেবে ততই তাদের জন্য মঙ্গল। সরকার স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন করলে মানুষ এতে আবারও ১/১১-এর ষড়যন্ত্র খুঁজবে।’