করোনা মহামারির থাবায় কাঁপছিল পুরো দেশ। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় মুহ্যমান মানুষ। মানুষের বিপদের এই সময়ে ফায়দা লুটতে তৎপর হয়ে ওঠে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, তাঁর ছেলে রাহাত মালেক শুভ্র, ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর সিন্ডিকেট। থলের বিড়াল বেরিয়ে এলে জানা যায়, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেনাকাটা জিম্মি ছিল এ সিন্ডিকেটের হাতেই।
সিন্ডিকেটে জড়িয়ে আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। এসব অনিয়ম তদন্তে অধিদপ্তর থেকে কেনাকাটার নথিপত্র সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার সম্পদ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা যে-কেউ হোন না কেন ছাড় দেওয়া হবে না। দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে বেশ কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করেছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ অভিযোগ রয়েছে, করোনাকালে মুন্সিগঞ্জের একটি কারখানায় এন-৯৫ নকল মাস্ক তৈরি করে ভুয়া আমদানি দেখিয়েছে এ সিন্ডিকেট। মানহীন মাস্ক, পিপিইসহ সুরক্ষাসামগ্রী ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি দামে সরকারিভাবে সরবরাহ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলে রাহাত মালেক শুভ্রসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা। তাঁরা কয়েকজন মিলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপের মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ বাণিজ্য, পদোন্নতিসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট খাত থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন তিনি ও তাঁর সিন্ডিকেটের সদস্যরা। রাহাত মালেক শুভ্রর নেতৃত্বে স্বাস্থ্যের কেনাকাটায় চলত এ সিন্ডিকেট। চক্রের কুশীলবের মধ্যে আছেন স্বাস্থ্য খাতের ডন খ্যাত টেকনোক্র্যাট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু, জেনেসিস ট্রেডিং কোম্পানির কর্ণধার জাহের উদ্দিন সরকার, ওএমসি হেলথকেয়ারের সিইও মাজবাহুল কবির, জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইস লিমিটেডের এমডি আবদুর রাজ্জাক ও মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন। এঁদের সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক তপনের নাম। সরকার কিংবা বিরোধীদলীয় যে-ই হোক না কেন, সিন্ডিকেটে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশন দিয়ে পেতে হতো ঠিকাদারি কাজ। হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটা করত কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)। তবে করোনাকালে অন্তত ৫১ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সরকারি আইন ও বিধি না মেনে চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করে। ওই কেনাকাটায় গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় দায়িত্ব নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের কেনাকাটার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সাল থেকে গত তিন বছর ৭২টি দরপত্রে ৩১৮ কোটি টাকার বেশি চিকিৎসা যন্ত্র কেনা হয়। ঘুরেফিরে ২৪টি প্রতিষ্ঠান এসব কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪২ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১৯ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৭ কোটি টাকার যন্ত্র কেনা হয়। সব কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করে জাহিদ মালেক-শুভ্র সিন্ডিকেট।
জানা যায়, স্বাস্থ্য খাতের ডন খ্যাত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর টেকনোক্র্যাট লিমিটেড কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত হয়। এরপর তিনি আত্মীয়স্বজনসহ নামে-বেনামে অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা করেন। গত তিন বছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তাঁর আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ট্রেড হাউস ১১টি প্যাকেজে ৫১ কোটি টাকার সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। মিঠুকে নিয়ে হাজারো বিতর্ক থাকলেও শুভ্র কাজ দিতে তাঁকেই বেছে নিয়েছেন। মিঠুর আরেক আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ওয়ান ট্রেড তিন প্যাকেজে ৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। এ ছাড়া তাঁর অধীনে থাকা এমএস মাইক্রো টেডার্স চার প্যাকেজে ১৭ কোটি, ছয় প্যাকেজে বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস ১৭ কোটি ও নয় প্যাকেজে টেকনোওয়ার্থ অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড ১১ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। করোনাকালে মিঠুর বিরুদ্ধে মামলা হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মিঠুর বন্ধু জাহের উদ্দিন সরকার বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি নামে স্বাস্থ্য ব্যবসা করেন। করোনাকালে নানা অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি কালো তালিকাভুক্ত করে অধিদপ্তর। কিন্তু জেনেসিস ট্রেডিং কোম্পানি নামে একটি প্যাকেজে ২ কোটি টাকার যন্ত্র সরবরাহ করেছে জাহের। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ দাম বেশি নিলেও সরবরাহ করেছে নিম্নমানের সরঞ্জাম।
আর গত তিন বছরে এসপি ট্রেডিং হাউস ৬ কোটি টাকার কাজ করেছে। সম্প্রতি দুদক ভুয়া বিলের মাধ্যমে প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিন চিকিৎসকসহ যে আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে, সেখানে জাহেরও রয়েছেন।
গত বছর জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইস লিমিটেড ২ কোটি টাকার যন্ত্র কেনাকাটার কাজ পায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাজ্জাক করোনাকালে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিইসহ স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সরবরাহে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন।
জাহিদ মালেকের থাবা থেকে মুক্তি পায়নি সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডও। ২০২২ সালের এপ্রিলে এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-এর একটি কারখানা মানিকগঞ্জে স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রকল্পের সম্ভাব্য এলাকা মেঘশিমুল মৌজায় আগেই জমি কিনে কারসাজি করে দলিলমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন জাহিদ মালেক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত সাড়ে ৩১ একর জমির মধ্যে ১১ একর ১৪ শতক জমি কেনেন জাহিদ মালেকের মেয়ে সিনথিয়া মালেক। মন্ত্রীর ছেলে রাহাত মালেকের মালিকানাধীন রাহাত রিয়েল এস্টেটের নামে কেনা হয় ৩ একর ১২ শতক জমি।