ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সফলভাবে নেতৃত্বদানের পর এবার রাজনীতির মাঠেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন তরুণরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুটি কৌশলে মাঠ সাজানো শুরু করেছে তরুণদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভিন্ন কোনো নামে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেবেন তাঁরা। দলের পক্ষ থেকে আগামী সংসদে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে ৩০০ সংসদীয় আসনেই দেওয়া হবে প্রার্থী।
প্ল্যাটফরম দুটির ব্যানারে এখন বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনসংযোগ ও প্রচার কার্যক্রমের পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ। জেলা, উপজেলা ও থানায় গঠন করা হচ্ছে প্রতিনিধি কমিটি। চলছে রাজনৈতিক দলের জন্য গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির কাজ।
নির্বাচনি রাজনীতির মাঠ নিয়ে তরুণদের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সহমুখপাত্র মুশফিক উস সালেহীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নির্বাচনে জেতা-হারার চেয়েও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হলো কি না, সেটাই হবে আমাদের সাফল্যের নির্ণায়ক। সিস্টেম বদলাতে তরুণরা এ রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর হাত ধরে সেই পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমরা আশাবাদী আগামী নির্বাচনে তরুণদের পাশাপাশি পরিবর্তনকামী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীও নতুন দলকে সমর্থন দেবে।’
দলীয় সূত্রে জানা যায়, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথরেখা কী হবে সেসব বিষয় তুলে ধরে তৈরি করা হচ্ছে নির্বাচনি ইশতেহার। জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তরুণরা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান তার প্রতিফলন থাকবে ইশতেহারে। থাকবে জনমানুষের আকাক্সক্ষার কথা, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়।
দলীয় গঠনতন্ত্রেও থাকবে নয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ধারণা বাইরে রেখে এমনভাবে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হবে যেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তৃণমূলের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। নিশ্চিত করা হবে মেধা ও যোগ্যতার বলে একজন তৃণমূল কর্মীও যেন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ পান সে বিষয়টি। দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না রাষ্ট্রীয় কোনো নির্বাহী পদে। একক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দলীয় প্রধান যেন স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে না পারেন সেজন্যও সুনির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করা হবে গঠনতন্ত্রে। এসব ধারাবলে দলের প্রধানকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি থাকবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাকে অপসারণের ব্যবস্থাও।
দলীয় গঠনতন্ত্র ও নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে চলছে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ। জাতীয় নাগরিক কমিটিসূত্রে জানা যায়, দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে দেশের সর্বত্র ম্যানপাওয়ার বাড়ানোর কার্যক্রম। গতকাল পর্যন্ত থানা, উপজেলা ও পেশাজীবী মিলিয়ে দেশব্যাপী ১৬৫টি প্রতিনিধি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক দলের ব্র্যান্ডিংয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন তরুণরা। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে নানাবিধ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে বেশ জোরেশোরে জনসংযোগ ও প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন তাঁরা। এখন জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের দাবিতে চলছে পাঁচ দিনব্যাপী জনসংযোগ কর্মসূচি। ৬ জানুয়ারি শুরু হওয়া এ কর্মসূচি শেষ হবে ১১ জানুয়ারি।
কর্মসূচির প্রথম দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে ছাত্রসমাবেশ। সেখানে বক্তারা বলেছেন, সরকারকে অবিলম্বে ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন’ ঘোষণা করতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যেভাবে শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, ঠিক সেইভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করতে হবে। আগে বিচার হবে, সংস্কার হবে; তারপর নির্বাচন। সংস্কার ও বিচারের আগে কোনোভাবেই নির্বাচন দেওয়া যাবে না।
একই দিনে জুলাই ঘোষণাপত্রের গুরুত্বসহ সাত দফাসংবলিত একটি লিফলেট মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া শুরু করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। এ সাত দফাকে জুলাই ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। সাত দফার মধ্যে রয়েছে- জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং আহতদের বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুচিকিৎসা প্রদানের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করতে হবে; অভ্যুত্থানে আওয়ামী খুনি ও দোসরদের বিচার নিশ্চিত করার স্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে; ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি সংবিধান বাতিল করে নির্বাচিত গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে; ঘোষণাপত্রে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নেতৃত্ব পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে; ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যোগসূত্র রেখে ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা পরিষ্কার করতে হবে; নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সব ধরনের বৈষম্য নিরসনের মধ্য দিয়ে নাগরিক পরিচয় প্রধান করে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে; জুলাই অভ্যুত্থানের একমাত্র প্রধান লক্ষ্য আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারকে উৎখাত করা ছিল না, বরং গত ৫৩ বছরের বৈষম্য, শোষণ ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিলোপ করার লক্ষ্যে এ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। সুতরাং বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো বিলোপ করতে সব ধরনের সংস্কারের ওয়াদা দিতে হবে।
এ ছাড়া গতকাল ৭ জানুয়ারি ফেলানী দিবসে সীমান্ত হত্যা ও ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিক্ষোভ সমাবেশ। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে জাতীয় নাগরিক কমিটির ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানার উদ্যোগে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দিনটি উপলক্ষে পৃথক কর্মসূচি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। বাংলামোটরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘ফেলানী হত্যা থেকে ডামি ইলেকশন : কেড়ে নেওয়া স্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোচনা সভা।