সংবিধান সংস্কারে গণভোট হওয়া উচিত বলে মনে করছে এ নিয়ে গঠিত সংস্কার কমিশন। তাদের যুক্তি, সংবিধান সংস্কারের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট দরকার। একটি জাতি এই পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে, সুতরাং তাদের কাছ থেকে অবশ্যই অনুমোদন নিতে হবে।
তবে গণভোট নিয়ে আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা কিছুটা দ্বিমত পোষন করে বিষয়টিকে মন্দের ভালো বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, স্বাভাবিকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইনগত কোন অধিকার নেই গণভোট আয়োজন করার। যেহেতু দেশে একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ও সরকার বিভিন্ন সেক্টরে সংস্কারের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে গণভোট করে সংবিধানের বিধানগুলোর ম্যান্ডেট নিলে মন্দ হয় না।
সংবিধান বিষয়ে ৫৪ হাজার মতামত ও ১২০টি দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করে সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করবে সেগুলো হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, টানা দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান এক ব্যক্তি হবেন না, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা, ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নেওয়ার বিধান, স্পিকারের একক ক্ষমতা নয় ও ২১ বছরেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া উল্লেখযোগ্য।
১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ১৭ বার পরিবর্তন করে একদলীয় ব্যবস্থা কিংবা সমরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এসব ঠেকাতে নানা প্রস্তাবনা দিতে যাচ্ছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। জানুয়ারির মাঝামাঝিতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে এসব প্রস্তাবনা জমা দেবে ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন কমিশন। সংবিধান সংস্কারে গণভোট প্রসঙ্গে কমিশন প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়টিকে এভাবে দেখি, রাজনৈতিক ঐকমত্য যখন তৈরি হবে, তখন একটা পথও বেরিয়ে আসবে। যেমন- একটি পথ হতে পারে সংবিধান সভা। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে সংবিধান সভা হতে পারে। আবার রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনে করে, তারা এ ব্যাপারে একটি সনদ তৈরি করে নির্বাচন করবে এবং পরবর্তী সংসদে সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধান পুনর্লিখন কিংবা পরিবর্তন করবে, সেটিও হতে পারে। নির্বাচনের আগে এটি করা হোক, আর পরে করা হোক না কেন, একটি গণভোট করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে গণভোটের পক্ষে। কারণ, এর জন্য জনগণের ম্যান্ডেট দরকার। বিশেষ পরিস্থিতির দোহাই দেয়া ছাড়া গণভোট আয়োজনের কোন এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশন কেবল সুপারিশ করতে পারবে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে-এটা কার্যকর করবে কে? অন্তর্বর্তী সরকার কি এটা পারবে? তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ ধরনের কাজ করার প্রসঙ্গ আসতো না। যেহেতু আমরা একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আছি সেজন্য এই প্রসঙ্গ উঠছে। বিশেষ পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে হয়তো এই সরকার কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, অতীতে হ্যাঁ, না ভোট থেকে শুরু করে নানা কারনে দেশে গণভোট হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি গণভোট করে সংবিধান সংস্কার করে তাহলে এখানে আইনগত কোন প্রশ্ন হয়তো উঠবে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে গণভোট করলে একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো বিষয় হবে না। তিনি বলেন, এই সরকারের কাজ হলো নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য যেসব প্রস্তুতি নেয়ার দরকার সেগুলো করে রাজনীতিবিদদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান সরকারের কাছে সংস্কারই এখন মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এটা করবে কেন? নিজেদের সুপারিশ প্রসঙ্গে নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রিয়াজ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অংশীজনদের একটা বড় অংশ কথা বলেছেন। তাদের আকাংখা ও চিন্তাগুলোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি। সেই আলোকেই দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার প্রবর্তন, দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়াসহ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাবনা আনা হচ্ছে।
অনেক ধরনের মতের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের একটা ভূমিকা থাকে। তাই এটাকে একটা ইতিবাচক হিসেবে আমরা বিবেচনা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর জায়গায় একটা জবাবদিহি তৈরি করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রথম ধাপে গঠিত ছয় সংস্কার কমিশনের সবগুলোরই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় পেয়েছে।