অন্তর্বর্তী সরকার না পারলেও পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত এনে বিচারের সম্মুখীন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমরা যদি না পারি, তার পর যারা আসবেন (ক্ষমতায়) তারা চেষ্টা করবেন। এটা জাতির একটা আকাক্সক্ষা। তাঁকে এনে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।’
গতকাল বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথী উপস্থিত ছিলেন।
হাসিনাকে ফেরত এনে বিচারের সম্মুখীন করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রয়েছে উল্লেখ করে প্রেস সচিব আরও বলেন, এটা আমাদের একটা দায়। এ জায়গা থেকে চুল পরিমাণ পিছপা হবে না (সরকার)। তিনি যে চোরতন্ত্র, গুমতন্ত্র জারি করেছিলেন, সেগুলোর জন্য এবং যে গুম ও খুন করেছেন, সেটার জন্য তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।’
গুম প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘হাসিনার আমলের পাপাচারের তো শেষ নেই। জানুয়ারির ৫ তারিখ (ভোটারবিহীন নির্বাচন) বলেন, তত্ত্বাধায়ক সরকার শেষ করে দেওয়া বলেন, শাপলা চত্বরের ম্যাসাকার বলেন বা মাওলানা সাঈদীকে নিয়ে ম্যাসাকার বলেন- আরও পরে ২০১৮ সালের রাতের ভোট বলেন এবং প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচারের যে কাহিনি বলেন- এই পাচারের তো শেষ নেই। প্রত্যেকটা জিনিস নিয়ে আমাদের কাজ হচ্ছে। হাসিনাকে আমরা বিচারের আওতায় আনব।’
প্রেস সচিব প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই যে ছোট ছোট বাচ্চাদের খুন করা হলো- এটার বিচার হবে না? তাঁকে তো বিচারের সামনে আনতে হবে। ‘পলিটিক্যাল পার্টি আমাদের অংশীদার। তারা যদি ক্ষমতায় আসেন, তারাও এই উদ্যোগে থাকবেন।’
ভারতের দিক থেকে জবাব পাওয়ার বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘শেখ হাসিনার ব্যাপারে আমরা একটা নোট ভারবাল পাঠিয়েছি। সে অনুযায়ী আমরা অফিসিয়ালি কোনো জবাব শুনিনি তাদের (ভারত) কাছ থেকে। তবে হাসিনাকে ফেরত আনার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, ‘হাসিনা তার বাবার খুনিদের পারস্যু করে অনেক জায়গা থেকে নিয়ে এসে এখানে বিচার করেছেন। তিনি তাঁর বাবার জন্য যেভাবে পারস্যু করেছেন, আমরা তার দ্বিগুণ, আরও অনেক বেশি পারস্যু করে তাঁকে বিচারের সম্মুখীন করব।’
ভারত ফেরত দেবে কি না- এমন প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, কোনো খুনিকে কেউ তো জায়গা দিতে চায় না। হাসিনা যে ভয়ানক কান্ডগুলো করেছেন, এগুলো ভারতীয় প্রেসেও অনেকে জানত না। ইদানীং কেউ কেউ লেখা শুরু করেছেন। পুরো পৃথিবী যখন জানবে যে কী ধরনের হত্যাকান্ড, কী ধরনের অনাচার, কী ধরনের স্বৈরতন্ত্র চালু করেছিলেন- এগুলো জানলে একটা চাপ তৈরি হবেই যে, তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা : জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তবে এই আলোচনা কবে শুরু হবে তার কোনো সুনির্দ্দিষ্ট টাইমফ্রেম দেননি তিনি। প্রেস সচিব বলেন, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সামনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথাবার্তা হবে। এখনো সুনির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করা হয়নি।’
কবে নাগাদ জুলাই বিপ্লবের ঘোষণা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা আমাদের ঘোষণায় বলেছিলাম কিছুদিনের মধ্যে।’
১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ছাত্রদের আলটিমেটামের বিষয়টি তুলে ধরে এক সাংবাদিক জানতে চান ১৫ দিনের মধ্যে ঘোষণা হবে কি না। জবাবে প্রেস সচিব আগের বক্তব্য তুলে ধরেন।
জুলাই বিপ্লবে ছয়জন সাংবাদিক হত্যার বিচার প্রসঙ্গে প্রেস সচিব বলেন, এটা আমাদের টপ প্রায়োরিটি। নিহতদের আত্মীয়-স্বজন এসেছিলেন, আমরা তাদের এ কথা জানিয়েছি। যারা যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
ভোটারবিহীন নির্বাচনে আমলা ও পুলিশ প্রশাসনের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, আমলাদের বিষয়টি জন প্রশাসন সচিব দেখবেন।
ভোটারবিহীন নির্বাচনে জড়িত প্রশাসনের কর্তারা কীভাবে পালিয়ে গেলেন জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, আগস্টের ৫ তারিখ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত কোনো সরকার ছিল না। সে সুযোগটা তারা নিয়েছে।
সাগর-রুনির তদন্ত : প্রেস সচিব জানান, সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের তদন্তের জন্য নভেম্বর মাসে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। নতুন করে ২৫-৩০ জনের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। অনেক কাজ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আশা করছি, পিবিআই ভালো কিছু করতে পারবে, উনারা প্রচুর শ্রম দিচ্ছেন।’
বিটিভি ও বাসস : বিটিভি ও বাসসকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, ‘পুরো পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থাকে। নিউজ এজেন্সি থাকে, এটা ভাইটাল একটা কাজ। স্টেট ব্রডকাস্টের মেইন প্রোগ্রামিং টিভি থাকে, নিউজ টিভি থাকে, ইংলিশ চ্যানেলের টিভি থাকে। আপনি যদি তুরস্কের দিকে দেখুন, রাশিয়ার দিকে দেখুন, ইন্ডিয়ার দিকে দেখুন, পাকিস্তানের দিকে দেখুন, ইন্দোনেশিয়ার দিকে দেখুন, চীনের দিকে দেখুন, এরা সবাই স্টেট ব্রডকাস্টকে বড় করছে। স্টেট ব্রডকাস্টের আলাদা একটা প্রয়োজনীয়তা আছে।’ ৩১ ডিসেম্বর বিটিভি নিউজ লঞ্চিং হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদিও পরীক্ষামূলকভাবে, আমাদের ইচ্ছা আছে এটাকে বড় করার। আমরা আশা করি বিটিভি এবং বাসস তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ভালো ভালো প্রোগ্রাম এবং নিউজ প্রেজেন্ট করতে পারবে। তাদের ইক্যুপমেন্টের অভাব, সেই জায়গাও তারা বিষয়গুলো দেখবে। সবাইকে আমাদের স্বাধীনতা দেওয়া আছে। সবাই বাংলাদেশের রুলস অনুযায়ী প্রেস ফ্রিডম ব্যবহার করতে পারবেন।’
ছাত্রদের ভিসা : উপপ্রেস সচিব বলেন, বুলগেরিয়া তাদের ভিসা কার্যক্রম ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে ট্রান্সফার করার কথা আগেই জানিয়েছিল। রোমানিয়া ভিয়েতনাম এবং ব্যাংকক থেকে বাংলাদেশি ছাত্রদের ভিসা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কাজাকস্তান জানিয়েছে, তারা ব্যাংকক থেকে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের ভিসা দেবে। এই তিনটি দেশ ছাড়াও আরও যেসব দেশ আছে তাদের সঙ্গেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরোপিয়ান ডেস্ক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।